আয়াত শিশু হত্যা মামলায় আবিরের মৃত্যুদণ্ড রায় ঘোষণা

চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ী মো. আবিরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে আলোচিত এই মামলার রায় বুধবার দুপুর একটার দিকে ঘোষণা করেন ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস। রায়ে আদালত তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন এবং পাশাপাশি অর্থদণ্ডও আরোপ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন জানান, আসামিকে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, জরিমানার এই অর্থ নিহত শিশুটির পরিবারকে প্রদান করতে হবে। একই রায়ে লাশ গুম করার অভিযোগে মো. আবিরকে আরও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় শোনার পরপরই আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, এই অপরাধ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং সমাজে চরম আতঙ্ক সৃষ্টিকারী একটি জঘন্য ঘটনা।

মামলার নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার কন্যা আয়াত ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর নিখোঁজ হয়। ঘটনার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরে পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন যৌথভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, শিশুটিকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন তাদের বাসার ভাড়াটে মো. আবির। ২৫ নভেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি অপহরণ ও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে তদন্ত সংস্থা জানায়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন জানায়, মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিপণ আদায়। কিন্তু পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে লাশ গুম করতে মরদেহ ছয় টুকরা করে বস্তাবন্দী অবস্থায় সাগরপাড় ও খালের পাশে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

এ মামলায় মো. আবির ছাড়াও তার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর সহযোগীকেও আসামি করা হয়। ওই কিশোরের বিচার শিশু আদালতে পৃথকভাবে চলমান রয়েছে।

আয়াতের বাবা সোহেল রানা রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তিনি রায়ে সন্তুষ্ট হলেও দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত ভবনের বাইরে নিহত শিশুটির স্বজন ও সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়। তারা সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ব্যানার প্রদর্শন করেন এবং আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো—

ধাপতারিখঘটনা
নিখোঁজ১৫ নভেম্বর ২০২২শিশু আয়াত নিখোঁজ হয়
গ্রেপ্তার২৫ নভেম্বর ২০২২মো. আবির গ্রেপ্তার হন
অভিযোগপত্র১০ অক্টোবর ২০২৩তদন্ত সংস্থা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে
রায় ঘোষণাবুধবারমৃত্যুদণ্ড ও অতিরিক্ত কারাদণ্ড প্রদান

এই রায়কে চট্টগ্রামের আলোচিত শিশু হত্যা মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকায় মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়নি।