জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:২ পিএম

আরও একবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের দেয়াল টপকাতে পারল না পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই, অর্থাৎ শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ইউরোপীয় পরাশক্তি নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিতে হলো সেলেসাওদের। তবে এই পরাজয়ের চেয়েও বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে দলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা এই মহাতারকা বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে একই সাথে স্পর্শ করেছেন চরম আক্ষেপের এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড এবং কিংবদন্তি পেলের পাশে বসার এক অনন্য কীর্তি।
Table of Contents
নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে শুরু থেকেই ছন্দহীন ছিল কার্লো আনচেলত্তির দল। একের পর এক আক্রমণ করেও গোল করতে ব্যর্থ হয় ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডরা। উল্টো নরওয়ের ক্ষুরধার কাউন্টার অ্যাটাকে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে তারা। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার জুনিয়র। দীর্ঘ চোটের কারণে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে সবমিলিয়ে মাত্র ৩৬ মিনিট মাঠে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করে নেইমার ব্যবধান ২-১ করলেও তা কেবল সান্ত্বনাই এনে দিয়েছে, দলের হার এড়াতে পারেনি। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড, যা ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির করুণ এক চিত্র।
নরওয়ের কাছে এই হারের পর নেইমার এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে নাম লেখালেন, যা কোনো ফুটবলারই চান না। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অধরা ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখা হলো না তার। ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—এই চারটি আসরে ব্রাজিলের স্বপ্নসারথি হয়েও প্রতিবারই তাকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। এর আগে ব্রাজিলের হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের একমাত্র মালিক ছিলেন সাবেক রক্ষণভাগ তারকা থিয়াগো সিলভা (২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২)।
অথচ ব্রাজিলের ইতিহাসে চার বা তার বেশি বিশ্বকাপ খেলার গৌরব রয়েছে ফুটবল সম্রাট পেলে, কাফু, রোনালদো নাজারিও, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো এবং দালমা সান্তোসের। কিন্তু নেইমার ও সিলভার ট্র্যাজেডি হলো, এই তালিকার বাকি প্রত্যেকেই তাদের ক্যারিয়ারে অন্তত একবার হলেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন।
বিদায়ের ক্ষণে এক বুক আক্ষেপ থাকলেও ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে গেছেন নেইমার। ফুটবলের রাজা পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি গোলটি তাকে এই অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
যদি এটিই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে, তবে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি নিজের করেই বিদায় নিচ্ছেন। নিচে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সামগ্রিক পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের খুঁটিনাটি | অর্জিত ডেটা ও পরিসংখ্যান |
| মোট আন্তর্জাতিক ম্যাচ | ১৩০টি |
| সর্বমোট গোল (ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ) | ৮০টি |
| মোট অ্যাসিস্ট (গোল করানো) | ৫৮টি |
| অংশগ্রহণকৃত বিশ্বকাপের আসর | ৪টি (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) |
| বিশ্বকাপের ভিন্ন আসরে গোল করার রেকর্ড | ৪টি (পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান) |
| জাতীয় দলের হয়ে একমাত্র প্রধান শিরোপা | ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশনস কাপ |
| অলিম্পিক ফুটবলে বড় অর্জন | ২০১৬ রিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক (অনূর্ধ্ব-২৩) |
| চার বা তার বেশি বিশ্বকাপ খেলা ব্রাজিলিয়ানরা | পেলে, কাফু, রোনালদো, সিলভা, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো, দালমা সান্তোস |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা ম্যাচ সংখ্যা | ২টি (বনাম স্কটল্যান্ড ও নরওয়ে) |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠে কাটানো মোট সময় | ৩৬ মিনিট |
“এখানেই শুরু, এখানেই শেষ”— ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ইঙ্গিত দিয়ে নেইমারের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগঘন উক্তিটি বিশ্বজুড়ে লাখো সেলেসাও ভক্তের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক জাদুকরের আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হলো একরাশ আক্ষেপ আর ট্র্যাজিক এক সমাপ্তির মধ্য দিয়ে।
মন্তব্য