খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:৩৮ পিএম

বাংলাদেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে যে কজন শিল্পী তাঁদের অসাধারণ সাধনা, প্রতিভা ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন, তাঁদের অন্যতম একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সরোদশিল্পী ওস্তাদ শাহাদাত হোসেন খান। তাঁর সরোদের সুর শুধু শ্রোতাদের মুগ্ধ করেনি, বরং বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। জন্মদিনে এই গুণী শিল্পীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন।
১৯৫৮ সালের ৬ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের একটি ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাহাদাত হোসেন খান। জন্ম থেকেই তিনি এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে সংগীত ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই আবহেই তাঁর সংগীতজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তিনি ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর নাতি। তাঁর পিতা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান ছিলেন দেশের প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী ও সেতারবাদক। পারিবারিক পরিমণ্ডলে আরও ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত বহু গুণীজন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আম্বিয়া খানম, বাহাদুর হোসেন খান, সংগীত গবেষক ও লেখক মোবারক হোসেন খান, সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান, তানসেন খান, মমতা খানম, ইয়াসমিন খানম, বিটোফেন খান, কোহিনূর খানম এবং রিজিয়া বেগম। এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত।
শৈশবেই পিতা ও পরিবারের প্রবীণ গুরুজনদের কাছে তাঁর সংগীতশিক্ষার সূচনা হয়। কঠোর অনুশীলন, অধ্যবসায় এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরার শিক্ষায় তিনি ধীরে ধীরে সরোদবাদনে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন। তাঁর পরিবেশনায় শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা, কারিগরি দক্ষতা এবং আবেগের অনন্য সমন্বয় ফুটে উঠত। এ কারণেই তিনি দেশীয় মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিবেশন করে তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর পরিবেশনায় ভারতীয় উপমহাদেশের ধ্রুপদি সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যও প্রতিফলিত হয়েছে। বিদেশি শ্রোতাদের কাছেও তিনি বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সংগীতজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একজন সফল শিল্পীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সুরসাধক ও শিক্ষক, যিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর কাছে সংগীত ছিল শুধু শিল্পচর্চা নয়, বরং একটি সাধনা এবং সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
২০২০ সালের ২৮ নভেম্বর এই বরেণ্য শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তবে একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় তাঁর সৃষ্টিকর্মেই বেঁচে থাকে। শাহাদাত হোসেন খানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর সরোদের মূর্ছনা, শিল্পীসত্তা এবং দীর্ঘদিনের সুরসাধনা আজও সংগীতপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
জন্মবার্ষিকীতে এই মহান সুরসাধকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান আগামী প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে মূল্যবান হয়ে থাকবে।
মন্তব্য