অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জিতে ইতোমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে পাওয়া সেই জয় শুধু একটি ম্যাচের সাফল্য নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সক্ষমতারও বড় প্রমাণ। এবার সেই অর্জনকে আরও বড় সাফল্যে রূপ দেওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দল। দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে জয় কিংবা ড্র—দুই ফলই বাংলাদেশকে সিরিজ জয়ের সুযোগ এনে দিচ্ছে। আর সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আত্মবিশ্বাসী মেহেদী হাসান মিরাজ।
২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ জয় পেলে অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজ নিজেদের করে নেবে। ম্যাচটি ড্র হলেও সিরিজের প্রথম টেস্ট জয়ের সুবাদে বাংলাদেশের হাতেই থাকবে সিরিজ জয়ের ট্রফি। ফলে এই ম্যাচটি দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে বিরল এক অর্জনের সুযোগ।
তবে প্রথম টেস্টের জয় নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিতে ভুগতে রাজি নন মিরাজ। তাঁর দৃষ্টিতে ডারউইনের জয় এখন অতীত। দ্বিতীয় টেস্টে নতুন করে পরিকল্পনা সাজিয়ে শূন্য থেকেই লড়াই শুরু করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একটি ম্যাচ জেতার পর পরের ম্যাচে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেই মনে করছেন তিনি।
সিরিজ জয়ের স্বপ্ন যে দলের মধ্যে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করেছেন মিরাজ। তবে শুধু ফলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। প্রতিটি সেশন, প্রতিটি ওভার এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখাই হবে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রথম টেস্টে যে লড়াকু মানসিকতা দলকে সাফল্য এনে দিয়েছে, ম্যাকাইয়েও সেটি ধরে রাখতে চান তিনি।
ডারউইনের জয়ে মিরাজ নিজেও ছিলেন অন্যতম নায়ক। ব্যাট হাতে কঠিন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতক করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় ধাক্কা দেন তিনি। দলের প্রয়োজনের সময় ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই অবদান রেখে অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের গুরুত্ব আরও একবার প্রমাণ করেন মিরাজ।
তবে বাংলাদেশের জয় ছিল দলীয় প্রচেষ্টার ফল। হাসান মাহমুদ ম্যাচে মোট নয়টি উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বারবার চাপে ফেলেন। প্রথম ইনিংসেই তাঁর শিকার ছিল ছয় উইকেট। অন্যদিকে তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত শতক বাংলাদেশের ব্যাটিংকে শক্ত ভিত এনে দেয়। ফলে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই বাংলাদেশ সমন্বিত পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম হয়।
এই সাফল্যের পেছনে ছিল কঠিন প্রস্তুতির সময়ও। সিরিজ শুরুর আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ায় দলের প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেই ধাক্কা মূল সিরিজে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারেনি। বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মূল ম্যাচে নিজেদের নতুনভাবে মেলে ধরেছে দল।
মিরাজের কথায়, দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবালের উৎসাহও কঠিন সময়ে তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে কীভাবে বোলিং ও ব্যাটিংয়ে মানিয়ে নিতে হবে, সে বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা করেছেন তিনি। এমনকি অনুশীলনে মিরাজকে বোলিং করেও প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করেছেন।
স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মিরাজ। প্রস্তুতি ম্যাচের হতাশার পর দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখার বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচে ব্যর্থতা আসতেই পারে, কিন্তু একটি খারাপ ফল যেন পরের ম্যাচের আত্মবিশ্বাস নষ্ট না করে—এই মানসিকতা তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখন সেই আত্মবিশ্বাসকে আরও বড় অর্জনে পরিণত করার পালা। দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ জয় পেলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ জয়ের সুযোগ বাস্তবে রূপ নেবে। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
২-০ ব্যবধানে সিরিজ শেষ করতে পারলে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় স্থানে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার স্বপ্নও আরও জোরালো হতে পারে। তাই ম্যাকাইয়ের ম্যাচটি কেবল একটি সিরিজ নির্ধারণী লড়াই নয়; বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডারউইনের জয় বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু মিরাজ জানেন, ইতিহাস গড়ার পর ইতিহাস আরও বড় করা কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই এখন বাংলাদেশের সামনে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্মৃতি পেছনে রেখে দ্বিতীয় টেস্টে একই নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও লড়াইয়ের মানসিকতা ধরে রাখতে পারলেই বহুদিনের অপেক্ষার একটি বড় স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে পারে।









