বায়ুমণ্ডলীয় নদী: ঝড় ও বৃষ্টির নতুন হুমকি

বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলে “অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিভার” বা বায়ুমণ্ডলীয় নদীর বিস্তার ও আর্দ্রতার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই পরিবর্তন কেবল বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নয়, বরং বৃষ্টির ধরন, আঘাতের স্থান এবং তীব্রতায়ও প্রভাব ফেলছে। পুরনো নকশার অবকাঠামো এবং প্রচলিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন কার্যকর নয়। এর ফলে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহরগুলোতে সুনামি, ঘূর্ণিঝড় এবং চরম বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান।

বায়ুমণ্ডলীয় নদী হলো আকাশে ভাসমান আর্দ্রতার দীর্ঘ করিডর, যা সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী লেক্সি হেনি বলেন, “উষ্ণায়নের কারণে ঝড়ের মধ্যে আর্দ্রতার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮০ সালের তুলনায় বর্তমানে এই আর্দ্র করিডর ৬–৯ শতাংশ বেশি এলাকা আচ্ছাদিত করছে।”

এই বৃদ্ধির পেছনে পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাউসিয়াস-ক্ল্যাপেইরন সূত্র কাজ করছে। সূত্র অনুযায়ী, বায়ুর তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে বায়ুর আর্দ্রতা ধারণক্ষমতা প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে যায়। ফলে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল এখন অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প বহন করতে সক্ষম। যখন এই বাষ্প পাহাড় বা শীতল বায়ুর সংস্পর্শে আসে, তখন তা ভারী বৃষ্টিতে পরিণত হয়।

শুধু আর্দ্রতার বৃদ্ধি নয়, বায়ুর গতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণায়নের কারণে মেরু এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলের তাপমাত্রার পার্থক্য কমছে, যা বায়ুপ্রবাহে পরিবর্তন আনছে। এর ফলে আর্দ্র করিডর সমুদ্রের ওপর দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারে অথবা ভিন্ন কোণ থেকে স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, গড় আর্দ্রতা বা গড় বৃষ্টিপাতের হিসাব কখনো মূল বিপদের সংকেত দেয় না। চরম ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আর্দ্রতা পরিবহনের হার ৩–৪ শতাংশ এবং জলীয় বাষ্প জমার হার ৪–৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে চরম ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতের ৪০–৭৫ শতাংশ ঘটনা বায়ুমণ্ডলীয় নদীর সঙ্গে যুক্ত।

নিচের টেবিলে বায়ুমণ্ডলীয় নদীর প্রভাব ও ঝড়ের তুলনামূলক তথ্য দেখানো হলো:

বিষয়১৯৮০ সালবর্তমানবৃদ্ধি (%)
আর্দ্র করিডরের আচ্ছাদিত এলাকা১০,০০,০০০ বর্গকিমি১০,৬০০,০০০–১০,৯০০,০০০ বর্গকিমি৬–৯
ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আর্দ্রতা পরিবহন হার৩–৪%
ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে জলীয় বাষ্প জমা৪–৬%

বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া দপ্তর এই আর্দ্র করিডরের ওপর নজর রাখছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলেন, কেবল তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় শহরে এমন অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি যা হঠাৎ বাড়তি আর্দ্রতা ও ঝড়ের তীব্রতা সহ্য করতে পারে। বিদ্যুৎ লাইন, বন্দর ও যানবাহন ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।