ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে প্রথম টেস্টে নয় উইকেটের বড় ব্যবধানে হারের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছে অস্ট্রেলিয়া। মাঠের ব্যর্থতার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ধীরগতির ওভার রেটের বিষয়টি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওভার শেষ করতে না পারায় প্যাট কামিন্সের দলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত রোববার ডারউইনে অনুষ্ঠিত টেস্টের চতুর্থ দিনে বাংলাদেশ মাত্র এক উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া জয়ের লক্ষ্য পেরিয়ে যায়। ফলে ১৪৯ বছরের টেস্ট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার জন্য পরাজয়টি হয়ে ওঠে বড় ধরনের হতাশার। বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স, ব্যাটারদের দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কার্যকর কৌশলের সামনে পুরো ম্যাচেই চাপে ছিল স্বাগতিকরা।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার ওভার রেটের হিসাব। ম্যাচের তৃতীয় দিনে তারা ৮৬ ওভার বোলিং করে। নির্ধারিত সময়ের হিসাবে তাদের ৯০ ওভার করার কথা ছিল। অর্থাৎ দিনের শেষে চার ওভার ঘাটতি থেকে যায়।
টেস্ট ক্রিকেটে সাধারণভাবে একটি দলকে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৫ ওভার করার লক্ষ্য পূরণ করতে হয়। পূর্ণ দিনের হিসাবে সেটি ৯০ ওভার। নির্ধারিত হারের চেয়ে কম বোলিং হলে ম্যাচ রেফারি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শাস্তির সুপারিশ করতে পারেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ম্যাচের বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সম্ভাব্য শাস্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট কেটে নেওয়ার ঝুঁকি। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফির একটি অংশ জরিমানাও হতে পারে। প্রতি ঘাটতি ওভারের জন্য ম্যাচ ফির সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার একজন খেলোয়াড়ের টেস্ট ম্যাচ ফি ২০ হাজার মার্কিন ডলার ধরে হিসাব করলে চার ওভারের ঘাটতিতে সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে জনপ্রতি ৪ হাজার ডলার। একাদশের ১১ খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে সেই অঙ্ক সর্বোচ্চ ৪৪ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ হিসাব; বাস্তবে শাস্তির পরিমাণ নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দিক থেকেও বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে তারা ৮৪ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে এবং জয়ের হার ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চার পয়েন্ট কাটা হলে তাদের পয়েন্ট ৮০-তে নেমে আসবে। তবে জয়ের হার অপরিবর্তিত থাকবে, কারণ এই হার নির্ধারণ করা হয় ম্যাচের ফলের ভিত্তিতে, সরাসরি অর্জিত পয়েন্টের ওপর নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৬ পয়েন্ট ও ৭৫ শতাংশ জয়ের হার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ডারউইন জয় তাদের অবস্থানও আরও শক্ত করেছে। বাংলাদেশ উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে, তাদের পয়েন্ট ৪০ এবং জয়ের হার ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
তবে ওভার রেটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও একেবারে নিখুঁত ছিল না। প্রথম ইনিংসে নির্ধারিত হারের তুলনায় তারা পিছিয়ে ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ৫৩ ওভারে অলআউট করে দেওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। ওভার রেটের শাস্তির নিয়মে ম্যাচের দৈর্ঘ্য, ইনিংসের সময়কাল এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনার সুযোগ থাকে। কোনো দলকে দীর্ঘ সময় ফিল্ডিং না করতে হলে বা ম্যাচ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে শেষ হয়ে গেলে ঘাটতি ওভার হিসাবের ক্ষেত্রে ছাড় প্রযোজ্য হতে পারে।
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ১৩৮ ওভার পর্যন্ত গড়ায়। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছাড় পাওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চার ওভারের ঘাটতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তিতে রূপ নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ম্যাচের আবহাওয়া, খেলার বিভিন্ন বিরতি, উইকেট পতন, চোট, রিভিউ বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে সময় নষ্ট হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য ধীরগতির ওভার রেটের শাস্তি অবশ্য নতুন অভিজ্ঞতা নয়। ২০২০ সালের বক্সিং ডে টেস্টেও তাদের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চার পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত দলটির চ্যাম্পিয়নশিপের হিসাবকে প্রভাবিত করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে পয়েন্টের ব্যবধান নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ চাপের মধ্যে পড়তে হয়।
ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে এই পরাজয় তাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য শুধু একটি টেস্ট হারার ঘটনা নয়। একদিকে দলের ব্যাটিং-বোলিংয়ের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য ওভার রেট শাস্তি তাদের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অবস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে। সিরিজের পরবর্তী ম্যাচে তাই কামিন্সদের সামনে কেবল ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জই নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ওভার শেষ করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









