খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৫৩ পিএম

ঠাকুরগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা, সরকারি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অক্সিজেন সরবরাহ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ড ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে একদিকে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা অক্সিজেন প্ল্যান্টটি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্ল্যান্টটি চালু থাকলে হাসপাতালের মোট অক্সিজেন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হওয়ার কথা ছিল। বাকি ২০ শতাংশ অক্সিজেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহ করার কথা।
কিন্তু স্থাপনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই প্ল্যান্টটি অচল হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি মেরামত না করায় বর্তমানে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পুরোটা বাইরের সরবরাহকারীর কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ। এতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অভিযোগে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাঃ ফিরোজ জামানের বিরুদ্ধে অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যও এখানে পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের নিজস্ব ল্যাবরেটরি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাবের বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র সচল থাকা সত্ত্বেও সেগুলো অচল দেখিয়ে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। এতে রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এবং সরকারি হাসপাতালে বিদ্যমান পরীক্ষার সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। বলা হয়েছে, হাসপাতালের প্রায় ৮০ শতাংশ এসির ক্ষেত্রে শুধু বাইরের কাঠামো বা কভার থাকলেও ভেতরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ নেই। তারপরও প্রতি বছর এসি ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য থাকা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে অচল বলে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতি মাসে এর জ্বালানি তেলের বিল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জেনারেটরটি চালু না থাকা অবস্থায় এক বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার জ্বালানি বিল দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও দুটি জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে থাকলেও সেগুলো এখনো স্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় নামমাত্র খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করা হলেও কাগজপত্রে সম্পূর্ণ সরবরাহ দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন বহিরাগত ব্যক্তি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। রোগীদের বিভিন্ন সেবা পেতে এসব ব্যক্তিকে অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সেবা নিতে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের চাপের মুখে পড়তে হলে তা চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অনিয়ম বা দুর্নীতির জন্য দায়ী করা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হাসপাতালের অক্সিজেন প্ল্যান্ট, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি, এসি ও জেনারেটরের বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পরীক্ষা করা, ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের বিলের সঙ্গে বাস্তব ব্যবহারের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা জরুরি।
সরকারি অর্থে নির্মিত ও কেনা অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকলে তার আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। আর সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও সরাসরি—কারণ সেবার ঘাটতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন চিকিৎসার জন্য সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল রোগীরা। তাই অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
মন্তব্য