খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ৫:১৮ পিএম

চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যার কারণে রেললাইন দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে টানা পাঁচ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে সংস্থাটিকে শুধু অগ্রিম টিকিটের অর্থ ফেরত দিতেই প্রায় ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এর বাইরে নতুন টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকা, যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া এবং পর্যটনভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার কারণে রেলের সামগ্রিক রাজস্বেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ভারী বর্ষণ ও বন্যাজনিত জলাবদ্ধতার কারণে গত ৭ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এই পাঁচ দিনে আগে থেকেই বিক্রি হওয়া মোট ১১ হাজার ৩৩৭টি অগ্রিম টিকিট বাতিল করতে হয়। এসব টিকিটের বিপরীতে যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা।
তবে ক্ষতির পরিমাণ কেবল টিকিট ফেরতের অর্থেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় নতুন করে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা যায়নি। ফলে সেবা পুনরায় চালু হওয়ার পরও কয়েক দিন প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী পাওয়া যায়নি। অনেক ভ্রমণপিপাসু কক্সবাজার সফর স্থগিত কিংবা বাতিল করেছেন। এতে শুধু চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুট নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারগামী যাত্রীদের যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা ও আয়েও।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার জানান, সাধারণ অবস্থায় রেললাইনের ওপর প্রায় চার ইঞ্চি পর্যন্ত পানি থাকলেও নিরাপদভাবে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু এবারের বন্যায় কয়েকটি স্থানে রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা যাত্রী ও অবকাঠামো—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তাই সাময়িকভাবে ট্রেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, টানা তিন দিন রেললাইন পানির নিচে থাকায় পানি সরে যাওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চালানো সম্ভব হয়নি। রেলপথের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলীরা পুরো লাইনের বিস্তারিত পরিদর্শন করেন। সবকিছু সন্তোষজনক মনে হওয়ার পর ১২ জুলাই ‘অ্যাডভান্সড পাইলটিং’ পদ্ধতিতে সীমিত গতিতে ট্রেন চলাচল শুরু করা হয়। এই পদ্ধতিতে চালকরা ধীরগতিতে ট্রেন পরিচালনা করেন এবং প্রতিটি অংশ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন দুই ফুট পানির নিচে চলে গেলেও অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, এই সময়ে ঢাকা–কক্সবাজার রুটের দুই জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন কেবল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলাচল করেছে, ফলে যাত্রীসেবা আংশিকভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, পাঁচ দিনের মধ্যে একটি সাপ্তাহিক বন্ধের দিন থাকায় পরিচালনাগত ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় পর্যটন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায়, যাত্রীসেবা এবং ভ্রমণ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারমুখী পর্যটকদের একটি বড় অংশ বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করেছেন বা সফর পিছিয়ে দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাই চট্টগ্রাম–কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেলপথকে আরও সহনশীল করে তুলতে নিচু এলাকায় রেললাইন উঁচু করা, আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সেতু ও কালভার্টের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নিয়মিত অবকাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্যোগের সময় দ্রুত পরিদর্শন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে এবং রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য