খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৩ পিএম

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গভীর রাতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কাজ চলাকালে বিস্ফোরণে চার শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে আরিফুল ইসলাম (৩৫) নামে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরের প্রায় ৬৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়ায় তাকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। অপর তিনজন তুলনামূলকভাবে কম আহত হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের চিতাশাল ১ নম্বর গলিতে দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। রাতের নীরবতার মধ্যে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটলে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের বাসিন্দারা ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করেন এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
গুরুতর আহত আরিফুল ইসলাম রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার লতাবর গ্রামের আলী আজগরের ছেলে। তিনি ফতুল্লার দেলপাড়া বাজারসংলগ্ন তানিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন এবং জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
ঘটনার বিষয়ে স্যানিটারি মিস্ত্রি আব্দুল জলিল জানান, দেলোয়ার হোসেনের বাড়িতে সড়ক কেটে একটি গ্যাস সংযোগ দেওয়ার জন্য ১৭ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল। কাজ শুরুর আগে ২ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ কাজ শেষে পরিশোধের কথা ছিল। তিনি বলেন, বিষয়টি দেলপাড়া এলাকার গ্যাস কন্ট্রাক্টর মাসুমকে জানানো হলে কয়েকজন শ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর আরিফুল ইসলামসহ অন্য শ্রমিকদের নিয়ে রাতেই কাজ শুরু করা হয়।
আব্দুল জলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, মাটি খুঁড়ে গ্যাসের পাইপ বের করার পর সংযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তীব্র শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে থাকা চার শ্রমিকই দগ্ধ হন। আরিফুলের আঘাত সবচেয়ে গুরুতর হলেও অন্য তিনজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আরিফুল ইসলামের শরীরের প্রায় ৬৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। এত বড় পরিসরে দগ্ধ হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাতের আঁধারে এ ধরনের কাজ পরিচালিত হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এমন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের নয়, আশপাশের বসতবাড়ি ও সাধারণ মানুষের জীবনও হুমকির মুখে ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। অনুমোদিত প্রকৌশলগত মান, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা ছাড়া গ্যাস লাইনে কোনো ধরনের সংযোগ বা পরিবর্তনের কাজ করা হলে সামান্য অসাবধানতাও ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড এবং ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং ঘটনার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে। কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ঠিকাদারদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বিস্ফোরণের সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগের কাজ চলছিল। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মন্তব্য