খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৫ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতির জেরে বৈশ্বিক অর্থবাজারে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করার দাবি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এখন কেবল যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার নীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রধান শেয়ারসূচকগুলো নিম্নমুখী ছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, শিল্প উৎপাদন, আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় এবং ভোক্তা মূল্যস্ফীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে হতে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ট্রেজারি বন্ডের ফলন ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে বন্ডের সুদহার বাড়ার ফলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে পরিচিত সোনার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নিম্নমুখী হয়েছে।
এদিকে বাজারের আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী পদক্ষেপ। সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক বিনিয়োগকারী। সে ক্ষেত্রে সুদহার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেবেন। তাঁর বক্তব্য থেকে ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতির দিকনির্দেশনা পাওয়ার আশায় রয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার।
একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জুন মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশেরও কথা রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম থাকায় মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই সম্ভাব্য স্বস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী হতে না-ও দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১১ ডলারে পৌঁছায়। কয়েক দিন আগেও যার দাম ছিল ৭০ দশমিক ১৪ ডলার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ দশমিক ৩৭ ডলারে উন্নীত হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর আগের সময়ের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করিডরগুলোর একটি। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। ফলে এখানে সামান্য নিরাপত্তা সংকটও আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি অতিক্রম করানো হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, স্বাভাবিক নৌপরিবহন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
বিনিয়োগকারীদের নজর এখন করপোরেট আয় ঘোষণার মৌসুমেও। মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ব্যাংক চলতি প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ শুরু করবে। এরপর নেটফ্লিক্স, জেনারেল ইলেকট্রিকসহ একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের আয় ও মুনাফার হিসাব প্রকাশ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাশার তুলনায় শক্তিশালী আর্থিক ফলাফল এলে বর্তমান বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করবে।
প্রযুক্তি খাত নিয়েও আশাবাদ রয়েছে। বিনিয়োগ ব্যাংক সিটির বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি আয় ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী। সাম্প্রতিক বাজার অস্থিরতা এসব প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সক্ষমতাকে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। তবে সপ্তাহের শুরুতে সেই আশাবাদের প্রতিফলন বাজারে দেখা যায়নি। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাকের ফিউচার সূচক নিম্নমুখী ছিল। ইউরোপের প্রধান শেয়ারসূচকের ফিউচারেও একই প্রবণতা দেখা যায়। জাপানের নিক্কেই সূচক টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য পতনের মুখে পড়ে। একই সঙ্গে জাপান বাদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই সূচকও দুর্বল অবস্থানে ছিল।
জ্বালানি বাজার নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নেও সতর্কতার সুর রয়েছে। সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক্সঅ্যানালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেলবিশ্লেষক মুকেশ সহদেবের মতে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ওপরে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও এই সময়ে দামে ওঠানামা থাকবে, তবু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তিনি আপাতত দেখছেন না।
তাঁর মতে, দূরপাল্লার জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই করতে হয়। এ কারণে বিশ্বের অনেক শোধনাগার ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতা কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
অন্যদিকে আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইজির বাজারবিশ্লেষক ফ্যাবিয়েন ইয়িপ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম খুব দ্রুত ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করার সম্ভাবনা এখনো সীমিত। তাঁর মতে, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার কারণে বাজারে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, নতুন করে সংঘাত বাড়ায় তা অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়েছে।
বন্ডবাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে ডলারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিপরীতে সুদবাহী সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ১ শতাংশের বেশি কমে ৪ হাজার ৭৬ ডলারে নেমে এসেছে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়। এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, মূল্যস্ফীতির গতিপথ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণ, শেয়ার ও বন্ডবাজারের প্রবণতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত বার্তা—সবকিছুই বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হবে।
মন্তব্য