খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪১ পিএম

ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরসভা এলাকায় পাঁচ বছরের এক অবুঝ কন্যাশিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক ঘটনার পর রোববার (১২ জুলাই) রাত পৌনে ১১টার দিকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মোস্তফা (৩৭) নামের এক যুবককে আটক করেছে নান্দাইল থানা পুলিশ। ধৃত মোস্তফা নান্দাইল পৌরসভার বাসিন্দা আব্দুর রাশিদের ছেলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ, ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, রোববার দুপুরে এই পাশবিক নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে। শিশুটির মা পেশায় একজন গৃহকর্মী। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ঘটনার সময় তিনি তার পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানটিকে ঘরে রেখে কিছু সময়ের জন্য পাশের একটি বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে কেউ না থাকার এই সুযোগটিই লুফে নেয় প্রতিবেশী যুবক মোস্তফা। সে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে শিশুটিকে একা পেয়ে বাড়ির পাশের বিলে নৌকায় চড়ানোর প্রলোভন দেখায়। অবুঝ শিশুটি মোস্তফার এই ফাঁদে পা দিলে সে তাকে ফুসলিয়ে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং সেখানে তার ওপর জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন চালায়।
পরবর্তীতে শিশুটির মা কাজ শেষে বাড়ি ফিরে মেয়েকে ঘরে না পেয়ে মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি প্রতিবেশীদের বাড়িসহ চারদিকে হন্যে হয়ে খোঁজখুঁজি শুরু করেন। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনি দেখতে পান, তার সন্তান গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে দূর থেকে বাড়ির দিকে হেঁটে আসছে। মেয়ের এই করুণ দশা দেখে মা চমকে ওঠেন। এ সময় মায়ের আকুল জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং মোস্তফা নামের ওই যুবকের নির্মম ও পাশবিক নির্যাতনের কথা মায়ের কাছে স্পষ্ট করে খুলে বলে।
ঘটনার পরপরই মারাত্মক এক সংকটে পড়ে যায় পরিবারটি। আমাদের গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত সামাজিক লোকলজ্জা এবং লোকজানাজানির তীব্র ভয়ে অসহায় পরিবারটি প্রথমে বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি মীমাংসা বা গোপন রাখার কথা ভাবলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। সময় বাড়ার সাথে সাথে শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হতে শুরু করে। তার শরীর থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকায় পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর আর কোনো সামাজিক বাধার কথা চিন্তা না করে, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আকরামুল্লাহ শিশুটির প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি জানান, পাঁচ বছরের এই শিশুটি অত্যন্ত নির্মম ও মারাত্মকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। হাসপাতালে আনার পরপরই চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, প্রাথমিক চিকিৎসার পরও শিশুটির শরীর থেকে রক্তক্ষরণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও আশঙ্কাজনক হওয়ায় এবং উন্নত চিকিৎসার অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন। বর্তমানে মমেক হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) শিশুটির নিবিড় চিকিৎসা চলছে।
এদিকে এই অমানবিক ও জঘন্য ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের আগুন জ্বলে ওঠে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। খবর পেয়ে নান্দাইল থানা পুলিশ কোনো রকম দেরি না করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে মাঠে নামে।
নান্দাইল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সম্রাজ মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ টিম অভিযানে নামে। রাতে নান্দাইল পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মোস্তফাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই জঘন্য অপরাধের পেছনে অন্য কোনো মোটিভ বা বিষয় জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ইতিমধ্যেই গভীর তদন্ত শুরু করেছে। ধৃত আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারটি দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।
মন্তব্য