খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ২:৩১ পিএম

ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার একটি তিনতলা ভবনের বিশাল ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গ জীবন শেষ হলো ৫৪ বছর বয়সী কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর বিদেশে থাকা একমাত্র বোন ও অন্যান্য স্বজনদের জানানো হলেও শেষ বিদায় জানাতে তাঁদের কেউ উপস্থিত হননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় আলীপুর কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। ঘটনাটি এলাকায় গভীর মানবিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকালে প্রতিদিনের মতো ভবনের এক ভাড়াটিয়া কোয়েল চৌধুরীর জন্য খাবার নিয়ে তাঁর ফ্ল্যাটে যান। দীর্ঘ সময় দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি প্রতিবেশীদের বিষয়টি জানান। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে।
উপস্থিত কয়েকজন বাসিন্দা জানান, উদ্ধার করার সময় তাঁর চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ দেখা যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা জানান, ততক্ষণে তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোয়েল চৌধুরীর বাবা হাশমত আলী চৌধুরী ও মা আছিয়া খানম সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। ২০০০ সালের দিকে তাঁরা পূর্ব খাবাসপুর এলাকায় ‘চৌধুরী ভিলা’ নামে পরিচিত ভবনটি কিনে বসবাস শুরু করেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পরিবারটি ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একমাত্র বোন উচ্চশিক্ষা ও পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কানাডায় চলে যান। দেশে থেকে যান দুই ভাই—বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী।
এলাকার মানুষের কাছে দুই ভাই ছিলেন পরিচিত মুখ। স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগলেও কখনো কারও সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেননি। বরং শান্ত-স্বভাবের এই দুই ভাইকে প্রায়ই শহরের বিভিন্ন সড়কে পাশাপাশি হাঁটতে দেখা যেত। কখনো ধীর পায়ে, কখনো হাত ধরে—তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল সবার চোখে পড়ার মতো।
প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু কোয়েল চৌধুরীর জীবনকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে। এরপর বিশাল ফ্ল্যাটে তিনি একাই বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত উপস্থিতি না থাকলেও ভবনের ভাড়াটিয়ারা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবেশীরাও সময় পেলেই খোঁজখবর নিতেন এবং প্রয়োজন হলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। স্থানীয়দের মতে, এই সহায়তাই ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা।
প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান জানান, সেদিন সকালে দরজা না খোলায় তাঁরা দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করলেও হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ভাষ্য, মৃত্যুর খবর কানাডাপ্রবাসী বোনকে জানানো হলে তিনি স্থানীয়দের দাফনের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদেরও খবর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কেউ সময়মতো উপস্থিত হননি। শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষের উদ্যোগেই দাফন সম্পন্ন হয়। পরে দূর সম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় কবরস্থানে এলেও দাফনের আগে পরিবারের ঘনিষ্ঠ কোনো সদস্য সেখানে ছিলেন না।
স্থানীয়দের আরও দাবি, প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যুর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এতে এলাকার মানুষের মধ্যে পরিবারের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, ছোটবেলায় বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই ভাইকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন। তবে স্থানীয়দের এই বক্তব্যের পক্ষে কোনো সরকারি নথি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচিত নয়।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান জানান, ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কোয়েল চৌধুরীকে উদ্ধার করে। তখন তিনি জীবিত ছিলেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে তাঁর মৃত্যুর পর এ বিষয়ে থানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আর কেউ অবহিত করেননি।
কোয়েল চৌধুরীর জীবনের শেষ অধ্যায় কেবল একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ নয়; এটি সমাজের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে। একাকীত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং বয়স্ক বা অসহায় মানুষের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব—এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি দেখিয়েছে, রক্তের সম্পর্ক অনুপস্থিত থাকলেও মানবিকতা অনেক সময় প্রতিবেশীদের হাত ধরেই সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়। জীবনের শেষ মুহূর্তে স্বজনদের নয়, বরং প্রতিবেশীদের সহমর্মিতাই কোয়েল চৌধুরীর শেষ যাত্রার সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে থাকে।
মন্তব্য