গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবের পর দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কাওরাইদ ইউনিয়নের দুটি গ্রামের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে শুরু হওয়া ঝড়ে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকটসহ প্রাত্যহিক নানা কাজে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
Table of Contents
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ ও প্রেক্ষাপট
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ভোরে শ্রীপুর উপজেলার ওপর দিয়ে শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ের তীব্রতায় কাওরাইদ ইউনিয়নের হয়দেবপুর ও জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গিয়ে বিদ্যুতের মূল লাইনের ওপর পড়ে। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর অধীনে থাকা এই এলাকায় ঝড়ের ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বেশ কয়েকটি খুঁটি ভেঙে যায় এবং সঞ্চালন তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এলাকাটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় এবং শুক্রবার শেষ বিকেল পর্যন্ত সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
পানীয় জলের সংকট ও হাহাকার
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে পানি সরবরাহে। বর্তমান সময়ে গ্রাম দুটির অধিকাংশ বাড়িতেই পানির জন্য বৈদ্যুতিক সাবমার্সিবল পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। টানা ৪০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গ্রামজুড়ে পানীয় জলের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেনের ভাষ্যমতে, অনেক বাড়িতে এক গ্লাস খাওয়ার পানিও অবশিষ্ট নেই। আশপাশে টিউবওয়েল বা বিকল্প পানির উৎস না থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এমনকি শুক্রবার জুমার নামাজের সময় স্থানীয় মসজিদগুলোতে অজুর পানির ব্যবস্থা করতেও মুসুল্লিদের হিমশিম খেতে হয়েছে। গোসল বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য পানির অভাবে গ্রামবাসী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত জনজীবন ও ফ্রিজের খাদ্যসামগ্রী
দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে জনজীবনের প্রতিটি স্তরে। হয়দেবপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম খান জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা মাছ, মাংস ও অন্যান্য পচনশীল খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হতে শুরু করেছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বৃদ্ধদের শারীরিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। রাতের বেলা আলোক স্বল্পতায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও মেরামত কাজ
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর কাওরাইদ সাবজোনাল অফিসের এজিএম মো. আনিছুর রহমান জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে গাছপালা ভেঙে পড়ার কারণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ঝড়ে বিদ্যুতের তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি খুঁটিও ভেঙে গেছে। বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একদল কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কাজের গতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শহিদুল্লাহ খান নামের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন যে, পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা ঢিলেঢালাভাবে কাজ করছেন, যার ফলে জনদুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মেরামত কাজে কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে। তবে তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে আজ শুক্রবার রাতের মধ্যেই হয়দেবপুর ও জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি
টানা ৪০ ঘণ্টার এই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের এই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের ধৈর্যচ্যুতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির অভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রুটিন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গ্রামবাসীদের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনে আরও দ্রুত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বিদ্যুৎ ছাড়া জীবনযাত্রা যে কতটা স্থবির হয়ে পড়তে পারে, হয়দেবপুর ও জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের এই পরিস্থিতি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এখন কেবলই অপেক্ষার পালা, কখন কাজ শেষ হবে এবং সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন ঘটলে রাতের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
