খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ৬:২২ পিএম

ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার নতুন করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র, গ্লাইড বোমা ও ড্রোন হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ। শনিবারের এসব হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মিত্র দেশগুলোর কাছে দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের ঘাটতি পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, রাশিয়ার অব্যাহত বিমান হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
বর্তমানে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদের সংকট। কিয়েভ জানিয়েছে, উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত এসব অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে এবং নতুন সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে দেশটি।
শনিবার ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী শহর সুমিতে বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া। স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শহরের ব্যস্ত এলাকায় দুটি গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে পাঁচজন নিহত হন এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। একটি বোমা একটি বাসস্টপে আঘাত হানে বলে জানানো হয়েছে। হামলার পর প্রকাশিত ছবিতে একটি হলুদ বাসের এক পাশ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। কাছের একটি আবাসিক ভবনের সামনের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুমি অঞ্চলের একটি সীমান্তবর্তী এলাকায় বিস্ফোরক যন্ত্রে পা পড়ে আরও একজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ গ্লাইড বোমা হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হন। একই সময়ে দক্ষিণের বন্দরনগরী ওডেসায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন। পূর্বাঞ্চলের খারকিভ শহরে একটি বেসামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলায় আরও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাতে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও সক্রিয় করা হবে, যাতে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে যেসব প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে গতি আনা প্রয়োজন।
জেলেনস্কি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া একটি সমঝোতার আওতায় ইউক্রেনকে নিজস্ব প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি এই উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতের হামলায় ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ছয়টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২১টি ড্রোন ব্যবহার করেছে। এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ। ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা অন্তত দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ১১১টি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রুশ হামলার মাত্রা বেড়েছে। ইউক্রেনের দাবি, চলতি মাসে রাজধানী অঞ্চলেই রুশ হামলায় ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
রাশিয়ার হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনও পাল্টা আক্রমণ জোরদার করেছে। দেশটির ড্রোন বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার দখল করা দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তারা একাধিক অভিযান চালিয়েছে।
ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর প্রধান রবার্ট ব্রোভদি দাবি করেছেন, এক রাতেই আজভ সাগরে ২১টি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে আরও সাতটি পণ্যবাহী ও সহায়ক জাহাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তার দাবি, চলতি সপ্তাহে মোট ৭৬টি জাহাজ ইউক্রেনীয় ড্রোন অভিযানের আওতায় এসেছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, এসব হামলার উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং তাকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনো তার অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেননি।
অন্যদিকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজভ সাগরের তাগানরগ উপসাগরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় চারটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে মিথানল বহনকারী একটি ট্যাংকারও ছিল। ওই হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ আরও জটিল আকার নিচ্ছে। বেসামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা—সবকিছুই এখন চলমান সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য