খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ৮:৫১ পিএম

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের সড়কগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬০ শিক্ষার্থী। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ১০৯ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি মনে করছে, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সচেতনতা কার্যক্রমের অভাবের কারণেই শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারলে শুধু দুর্ঘটনা কমানোই নয়, দায়িত্বশীল ও আইন মেনে চলা নাগরিক গড়ে তোলাও সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক নিয়মিত ও সমন্বিত কোনো কর্মসূচি দেশে গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রাণ হারাচ্ছে, আহত হচ্ছে এবং অনেকেই স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে ২০১১ সালের ১১ জুলাইয়ের মর্মান্তিক মিরসরাই ট্র্যাজেডির কথাও স্মরণ করা হয়। সেদিন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে শিক্ষার্থী বহনকারী একটি মিনিট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একক কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনাগুলোর একটি। ওই ঘটনার পর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকেই প্রায় প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। জানুয়ারিতে ৫৭টি দুর্ঘটনায় ৫৭ শিক্ষার্থী নিহত ও ২২ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৭ জন এবং আহত হন ১১ জন। মার্চে ৫৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬৭ জন, আহত হন একজন। এপ্রিলে ৫১টি দুর্ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হন। মে মাসে ৬১টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭৩ জন এবং আহত হন ২৩ জন। জুনে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৬০ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়, আহত হন আরও ২৭ জন।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অবসান। তাই সড়ক নিরাপত্তাকে কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে না দেখে শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি পাঁচটি সুপারিশও তুলে ধরেছে। সংস্থাটি পাঠ্যবইয়ে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি প্রতি মাসে অন্তত একবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে, জেব্রা ক্রসিং ও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক পারাপারের জন্য ‘রোড সেফটি গার্ড’ নিয়োগ এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রাণহানি রোধে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব।
মন্তব্য