খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৩:৫৮ পিএম

খাগড়াছড়ির রামগড়ে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি মো. শাহিনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বিচারক তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও কঠোর সাজার আদেশ প্রদান করেছেন। ঘটনার মাত্র এক বছরের মাথায় এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের আদালতের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হলো।
সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল) বিচারক শায়লা শারমিন জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. শাহিন আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল। রায় পড়া শেষ হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া মেনে সাজা পরোয়ানা মূলে তাকে কড়া পুলিশি পাহারায় খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
আদালতের নথি ও মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত বছরের ২৫ জুলাই খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার একটি স্থানীয় মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। ভুক্তভোগী ওই শিশুটির বয়স মাত্র সাত বছর। ঘটনার দিন অভিযুক্ত মো. শাহিন, যে পেশায় একজন স্থানীয় চা-দোকানি, শিশুটিকে একা পেয়ে ফুসলিয়ে পাশ্ববর্তী একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
ঘটনার পর শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো বিষয়টি জানাজানি হয়। এই অমানবিক ঘটনায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই নির্যাতিতা শিশুর বাবা বাদী হয়ে রামগড় থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর রামগড় থানা পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত চা-দোকানি শাহিনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশ মামলার তদন্তভার একজন দক্ষ কর্মকর্তার হাতে ন্যস্ত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ভুক্তভোগীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করেন এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আদালতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ভুক্তভোগী শিশু, তার বাবা, চিকিৎসক এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞ বিচারক সব সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব ও যুক্তিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনেন। সাক্ষ্য-প্রমাণে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই সর্বোচ্চ সাজার রায় প্রদান করেন।
আদালতে নিযুক্ত রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন:
“আমাদের সমাজে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। ঘটনার এক বছরের মধ্যেই এমন একটি স্পর্শকাতর মামলার নিষ্পত্তি হওয়াটা একটি মাইলফলক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করায় আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। এই রায়ের মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটির ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে এবং অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা গেছে।”
অন্যদিকে, এই রায়ে তীব্র অসন্তোষ ও দ্বিমত প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বেদারুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তারা এই রায়ে একেবারেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়ায় কিছু আইনি ফাঁক রয়ে গেছে এবং আসামি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তারা দ্রুতই প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।
মন্তব্য