খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫৪ পিএম

চার সন্তানকে পাশে নিয়ে নদীভাঙনে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া ভিটের ধারে উদাস চোখে বসে ছিলেন মিনারা বেগম। মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ আর খোলা আকাশ, পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি পুরোনো টিন। মাত্র চার বছর আগে তিস্তার করাল গ্রাসে হারিয়েছিলেন নিজের আদি ভিটেমাটি। এবার ব্রহ্মপুত্র নদ কেড়ে নিয়েছে তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও। বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসের পর নীরবতা ভেঙে আঞ্চলিক ভাষায় মিনারা বললেন—‘এলাও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইনি।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চরে ছিল মিনারা বেগম (৫৫) ও তাঁর স্বামী সাইফুল ইসলামের (৬০) সাজানো সংসার। তিস্তার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব এই দম্পতি চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল চরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে মিনারার বোনের ঘরে ঠাঁই নিয়েছিলেন। কিন্তু তিন দিন আগে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনে সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর পর থেকে চার সন্তানসহ এই পরিবারের দিন কাটছে খোলা আকাশের নিচে। কৃষিশ্রমিক সাইফুল ইসলাম নদী থেকে মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালান। নিজের বলতে কোনো জমিজমা বা স্থায়ী ঘরবাড়ি তাঁদের নেই। নদীভাঙনের নিষ্ঠুর চক্রে পড়ে বারবার অন্যের আশ্রয়েই কাটছে তাঁদের জীবন।
কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে মিনারার। তিনি জানালেন, এই চরে আসার পর থেকে স্থানীয় ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অভাবের সংসারে ঘুষের টাকা দিতে পারেননি বলে কাজ হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অনেকেই সরকারি ত্রাণ পেলেও ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় মিনারা বেগমের কপালে কোনো সাহায্য জোটেনি।
আজ বুধবার দুপুরে সরেজমিনে চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরে গিয়ে দেখা যায়, উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পসংলগ্ন সাতটি বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত সাত দিনে কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরের অন্তত ৭০টি পরিবার নিজেদের একমাত্র বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
একই দুর্দশার চিত্র দেখা গেল শাখাহাতি চরের আতাউর রহমানের (৩৫) পরিবারে। গত রোববার ব্রহ্মপুত্র তাঁর শেষ সম্বলটুকুও গিলে খেয়েছে। এখন ছোট সন্তানকে নিয়ে প্রতিবেশীর ভাঙা বারান্দায় রাত কাটছে তাঁর। আতাউর বলেন, ‘চর এলাকায় নতুন করে বাড়ি করতে গেলে জমি চুক্তিতে নিতে হয়। এর জন্য প্রায় এক লাখ টাকা লাগে। সেই সামর্থ্য বা টাকা তো আমার নেই।’
কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফলে জেলার অন্তত ৪০টির বেশি পয়েন্টে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চরের ভাঙন পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরের একমাত্র নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কড়াইবরিশাল বাজার।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান এই সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীতে ৪০টির বেশি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। তবে শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চর দুটি নদীর একদম মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় পাউবোর বিদ্যমান স্থায়ী নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা বা বড় ধরনের প্রতিরক্ষা কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান জানান, গত কয়েক দিনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতি, কড়াইবরিশাল ও বিশারচর এলাকার অন্তত ৭০টি পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জিআরের চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া মিনারার মতো যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বা বিশেষ সমস্যায় আছেন, তাদের খোঁজ নিয়ে সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
মন্তব্য