ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে গুঞ্জন আর সমীকরণ যেন হাত ধরাধরি করে চলে। চলমান বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আজ মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই ফুটবল অঙ্গনে গুঞ্জন ছিল, শক্তিশালী ইরানকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিতে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া নিজেদের সুবিধার্থে একটি সুবিধাজনক ড্র বা পাতানো ম্যাচের আশ্রয় নিতে পারে। তবে মাঠের খেলায় ৩-৩ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর এবং নাটকীয় ড্রয়ের পর সব ধরনের ষড়যন্ত্রের তত্ত্বকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন অস্ট্রিয়া দলের অভিজ্ঞ কোচ রালফ রাংনিক।
ম্যাচ শুরুর আগে অনেক ফুটবল বিশ্লেষকই ১৯৮২ বিশ্বকাপের সেই কুখ্যাত ‘ডিসগ্রেস অব গিজন’ বা গিজন কলঙ্কের স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। সেবার পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া নিজেদের মধ্যে সুবিধাজনক ম্যাচ খেলে আলজেরিয়াকে বিদায় করেছিল। কাকতালীয়ভাবে, এবার পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল ইরানকে বাদ দেওয়ার। তবে ম্যাচ শেষে অস্ট্রিয়ার ৬৭ বছর বয়সী জার্মান কোচ রাংনিক এই পাতানো ম্যাচের অভিযোগকে পুরোপুরি উপহাস করেছেন। তিনি দাবি করেন, মাঠের অবিশ্বাস্য লড়াই এবং বিশেষ করে ম্যাচের শেষ ৯০ সেকেন্ডের রোমাঞ্চই প্রমাণ করে যে দুই দলের মধ্যে আগে থেকে কোনো গোপন আঁতাত ছিল না।
খেলাটির দিকে তাকালে বোঝা যায় কেন একে নাটकीय বলা হচ্ছে। ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষের পর অতিরিক্ত সময়ে রীতিমতো গোল-বন্যা বয়ে যায়। খেলার ৯৩ মিনিটে আলজেরিয়ার অধিনায়ক রিয়াদ মাহরেজ এক দুর্দান্ত গোল করে নিজের দলকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। আলজেরিয়ার এই গোলের পর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা ইরানি সমর্থক ও ফুটবলপ্রেমীরা যখন অস্ট্রিয়ার বিদায় বা পাতানো ম্যাচের গন্ধ পাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘটে আসল অলৌকিক ঘটনা। ম্যাচের একদম শেষ শটে অস্ট্রিয়ার বদলি খেলোয়াড় সাশা কালাইজিচ জাদুকরী এক গোল করে দলকে ৩-৩ সমতায় ফেরান।
ম্যাচের এই অভাবনীয় সমাপ্তি নিয়ে রাংনিক বলেন, ‘যখন একটি ম্যাচ ৩-৩ গোলে ড্র হয়, তখন কেউ কোনোভাবেই ধারণা করতে পারে না যে এটি আগে থেকে ঠিক করা চুক্তি ছিল। খেলার আর মাত্র তিন মিনিট বাকি, এমন সময় যদি কেউ বলত যে এই ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তবে আপনি তাকে নিশ্চিত পাগল বলতেন। আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে ফুটবলে কোচের দায়িত্ব পালন করছি, কিন্তু এত নাটকীয় মোড় আর অপ্রত্যাশিত রূপ নেওয়া কোনো ম্যাচ আমার স্মৃতিতেও নেই।’ তিনি হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে আরও যোগ করেন, ‘সবাই যেখানে একটা ম্যাড়মেড়ে ০-০ বা ১-১ গোলের ড্র দেখার অপেক্ষায় ছিল, সেখানে ম্যাচটি শেষ হলো ৩-৩ ব্যবধানে! আলফ্রেড হিচককও যদি এমন কোনো সাসপেন্স নাটক লিখতেন, তাহলেও সম্ভবত আমি বলতাম তিনি পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছেন।’
এই ড্রয়ের ফলে সমীকরণের হিসাব অনুযায়ী ‘জে’ গ্রুপের রানার্স-আপ হিসেবে অস্ট্রিয়া এবং অন্যতম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে আলজেরিয়া—উভয় দলই বিশ্বকাপের শেষ ৩২ বা নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে কপাল পুড়েছে ইরানের। বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। রাংনিক মনে করেন, রিয়াদ মাহরেজের ওই গোলের আগ পর্যন্ত দুই দলের খেলোয়াড়রাই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছিল। শেষ দিকে দুই দলই ড্রয়ের মানসিকতা নিয়ে খেলছিল—এমন দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট যারা দেখেছেন, তারা সবাই ভালো করেই জানেন যে খেলোয়াড়রা কেবল একটা ড্রয়ের জন্য খেলছিল—এমন কোনো ইঙ্গিতই সেখানে ছিল না।’
দীর্ঘ ৪৪ বছরের খরা কাটিয়ে অস্ট্রিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তোলার পর এই ঐতিহাসিক সাফল্যের রেশ যেন এখনো কাটিয়ে উঠতে পারছেন না এই অভিজ্ঞ মাস্টারমাইন্ড। আবেগপূর্ণ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি একই সাথে স্বস্তি পাচ্ছি, আবার নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। এখনো পুরো বিষয়টা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। এই সুন্দর স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার জন্য মনে হচ্ছে কেউ আমাকে একটা চিমটি কাটুক!’ আগামী ২ জুলাই ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হবে রাংনিকের এই লড়াকু অস্ট্রিয়া।









