জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

হবিগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ: ১৭১ কারখানায় স্থবিরতা, বেকার দেড় লাখ শ্রমিক

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকট। টানা ২০ দিন ধরে অপর্যাপ্ত সরবরাহের পর গত বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেল থেকে জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ একযোগে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এই আকস্মিক পদক্ষেপে পুরো জেলাজুড়ে শিল্প উৎপাদন পুরোপুরি থমকে গেছে। কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে পড়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে অলস সময় পার করছেন।

শিল্পমালিকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় কারখানাগুলোর সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ প্রতিদিন ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর একটি বড় অংশই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল উৎস। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, সুতা, ডেনিম এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে চরম বিপাকে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে বা শিপমেন্ট দিতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে একের পর এক কোটি কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক কারখানা নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হয়ে পুরো প্রাঙ্গণ অন্ধকারে ডুবে গেছে।

জেলাটির শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এই সংকটের প্রভাব কতটা মারাত্মক, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য থেকেই ফুটে ওঠে:

  • সায়হাম গ্রুপ: প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, গত ২২ জুলাই থেকে তারা চাহিদার তিন বা চার ভাগের এক ভাগ গ্যাস পাচ্ছিলেন। তবে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। দৈনিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে তারা এক ছটাচ্ছটাক গ্যাসও পাচ্ছেন না। জাতীয় গ্রিডের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় ২৭ হাজার কর্মী একপ্রকার অন্ধকারে বসে আছেন। দিনে তাঁদের ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

  • হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক (প্রাণ-আরএফএল): পার্কটির মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শিল্পপার্কের উৎপাদন কাজ পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছে। ৩৫ হাজার কর্মী কাজ না পেয়ে বেকার সময় কাটাচ্ছেন।

  • যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক: টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো বড় ৬টি ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত এই পার্ক। এর মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, প্রতিদিন ১৩.৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট অনুমোদিত চাহিদার বিপরীতে কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন মিলছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে তাও বন্ধ। এখানকার ১২ হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন এবং দিনে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

  • বাদশা পাইওনিয়ার: প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মো. খায়রুল আলম জানান, দৈনিক ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় বুধবার দুপুর থেকে পুরো উৎপাদন শাটডাউন করা হয়েছে। এর ফলে ১৬ হাজার কর্মী অলস বসে আছেন এবং দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ কোটি টাকা।

  • এসএম স্পিনিং কারখানা: দৈনিক ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন সাড়ে ১৩ হাজার মানুষ। মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস বন্ধ থাকায় দিনে ক্ষতি হচ্ছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকা)।

  • স্কয়ার ডেনিম: ২০ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় ৩ হাজার শ্রমিকের শতভাগ রপ্তানিমুখী এই কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ আক্ষেপ করে জানান, সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারলে বিদেশি বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেবে, যা পুরো শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হবে।

হবিগঞ্জের এসব কারখানার বড় একটি অংশ পল্লী বিদ্যুৎ বা পিডিবির গ্রিড ব্যবহার না করে নিজস্ব ক্যাপটিভ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত। ফলে গ্যাস বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে তাঁদের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস কমানো বা বন্ধ করার বিষয়ে লিখিত চিঠি দিলেও সেখানে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করায় একধরনের বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

তবে এই সংকটের ব্যাখ্যা দিয়ে জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, এটি মূলত একটি জাতীয় সংকট, যা জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে শুরু হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত গ্যাস ডাইভার্ট বা সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ফলে সাময়িকভাবে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে এই গ্যাসের জোগান পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।

Tags :

Md. Sakib

Recent News