কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২৮১ জনে পৌঁছেছে। সোমবারের এই প্রলয়ংকরী ৭.৪ মাত্রার ভূকম্পনে গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯৭১ জন। চার দিন পেরিয়ে গেলেও ধসে পড়া সুবিশাল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, এখনো ৩৭৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা সারা দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দ্রুত মানবিক সাহায্যের আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডব কাটিয়ে উঠতে বিপুল বিনিয়োগ ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা নিশ্চিত করেছে, এটি গত এক দশকে দেশটির ভূখণ্ডে অনুভূত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। সান হোসে দেল পালমারের প্রায় ৩ মাইল পূর্বে উৎপত্তিস্থল হওয়ায় এর তীব্র ঝাঁকুনি সীমান্তবর্তী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের মহাপরিচালক ডেভিড সান্তিয়াগো তামায়ো এই ভূকম্পনে সার্বিক ধ্বংসযজ্ঞের যে প্রশাসনিক চিত্র তুলে ধরেছেন, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
| ক্ষতির খাত/বিবরণ | ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ/সংখ্যা |
| ভূমিকম্পের মাত্রা | ৭.৪ (রিখটার স্কেল) |
| মোট নিহতের সংখ্যা | ২৮১ জন |
| আহতের সংখ্যা | ৩,৯৭১ জন |
| নিখোঁজের সংখ্যা | ৩৭৯ জন |
| সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর | ১২,০০০-এর বেশি |
| আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর | ৭৪,০০০-এর বেশি |
| ধসে পড়া মোট ভবন | ১৭০টির বেশি |
| ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক | ২০০টির বেশি |
| ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সেতু | ২০টি |
| ধসে পড়া পথচারী সেতু | ১টি |
| ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর | ৫টি |
| ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা | ৪৪টি |
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ধসে পড়েছে চোকো বিভাগের পেরেইরা শহর এবং ভায়ে দেল কাউকা বিভাগের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কালি। বিশেষ করে ২২ লাখ অধিবাসীর কালি শহরেই অন্তত ৯৫ জন মারা গেছেন। সেখানকার ক্লিনিকা কলম্বিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের একটি আবাসিক বহুতল ভবন মাটিতে মিশে গেছে, যেখানে বহু মানুষ চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারে সেনাবাহিনী, উদ্ধারকর্মী ও শত শত স্বেচ্ছাসেবক একযোগে কাজ করছেন। সেনাদের বিশেষ দল সেখানে তাপ শনাক্তকারী ড্রোন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছে।
এই করুণ ট্র্যাজেডির মাঝেও কিছু অলৌকিক ঘটনা আশা জাগাচ্ছে। পেরেইরা শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ৩৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে নিউ জার্সির বার্গেনফিল্ডের এক মার্কিন নারীও রয়েছেন, যিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতর মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে প্রাণ হারান। বর্তমানে স্থানীয়দের সহায়তায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পাঠানো ৪০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল দুর্ঘটনাস্থলে তৎপর রয়েছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা পুরো অচল হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সময়মতো খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি পাঠানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় গড়ালেই জীবন্ত কাউকেই পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে, তবুও কোনো চেষ্টা বাকি রাখছেন না উদ্ধারকর্মীরা।









