মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের দামে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে ইসরাইলের নতুন সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ঘটনার পর বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ মারাত্মক বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সরবরাহ সংকটের উদ্বেগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (৮ জুন) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান মানদণ্ড—ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট)—উভয়ের দামেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রেকর্ড করা হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ৩.২০ ডলার বা ৩.৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৬.২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই কার্যদিবসে মার্কিন ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ২.৮৭ ডলার বা ৩.১৭ শতাংশ বেড়ে ৯৩.৪১ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।
নিচে সোমবারের বাজারচিত্র এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিশদ পরিসংখ্যান একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র
| তেলের ধরন | পূর্ববর্তী মূল্য (ডলার/ব্যারেল) | বর্তমান মূল্য (ডলার/ব্যারেল) | মূল্যের পরিবর্তন (ডলার) | শতাংশের হিসাব (বৃদ্ধি) |
| ব্রেন্ট ক্রুড | ৯৩.০৪ | ৯৬.২৪ | +৩.২০ | ৩.৩৯% |
| মার্কিন ডব্লিউটিআই | ৯০.৫৪ | ৯৩.৪১ | +২.৮৭ | ৩.১৭% |
এর আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমনের ইঙ্গিত মেলায় গত শুক্রবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। তবে সামগ্রিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে জুন মাসের বর্তমান সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামগ্রিকভাবে ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সোমবার ভোররাতে ইরানের রাজধানী তেহরান, তাবরিজ এবং ইসফাহান শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই আকস্মিক ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত অবসান হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে সংশয় ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট তথা বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশের প্রধান মাধ্যম ‘হরমুজ প্রণালি’ সচল ও স্বাভাবিক রাখার আশাও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। এই প্রণালি অবরুদ্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও গত রবিবার ইরান সরাসরি ইসরাইলের বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক চুক্তি এখনো সম্ভব। তিনি আরও জানান, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নতুন কোনো সামরিক হামলা বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্য দিকে, লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে ইরান। উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার পর ইসরাইল লেবাননের অভ্যন্তরে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর গত ৩ জুন উভয় পক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হতে পেরেছিল।
বিশ্ববাজারে উদ্ভূত এই সরবরাহ সংকট মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে গত রবিবার তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ টানা চতুর্থবারের মতো তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন বৃদ্ধি করার একটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং তেল উৎপাদনকারী সদস্য দেশগুলোর সীমিত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে এই উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বাস্তব কার্যকারিতা খুবই নগণ্য হবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিস্টাড এনার্জি’-র ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ লিওন বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান তীব্র উত্তেজনা এবং নানামুখী সংকটের প্রেক্ষাপটে ওপেক প্লাসের তেল উৎপাদন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব প্রকৃতপক্ষে শূন্যের কাছাকাছি।
