বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলার ইতিহাসে যে ক’জন সমাজসচেতন ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব তাঁদের অসামান্য সৃজনশীলতা এবং মানবিক চেতনার মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তিনি ছিলেন একাধারে বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী, বাঙালির শিল্প-আত্মপরিচয়ের অন্যতম রূপকার এবং লোকজ ঐতিহ্যের একনিষ্ঠ গবেষক। তাঁর তুলির আঁচড়ে বাংলার মাটি, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, নদী, দুর্ভিক্ষ, গণসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ অত্যন্ত জীবন্ত ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছিল। তিনি কেবল ক্যানভাসে ছবি আঁকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছেন।
Table of Contents
জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা) মহকুমায় একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তা এবং মাতা নাসিমা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। নয় ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন দ্বিতীয়। পিতার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী ময়মনসিংহ এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি স্থানীয় প্রকৃতি, গ্রামীণ শান্ত পরিবেশ, খোলা আকাশ, নদী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতেন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদের পরিবর্তনশীল রূপ এবং এর চারপাশের জনজীবন তাঁর কচি মনে ও শিল্পভাবনায় অত্যন্ত গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর বহু বিখ্যাত শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিল্পশিক্ষা ও প্রতিভার বিকাশ
পারিবারিক ইচ্ছা কাটিয়ে চিত্রকলার প্রতি প্রবল অনুরাগের কারণে ১৯৩৩ সালে জয়নুল আবেদিন ভারতের কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট (বর্তমান সরকারি আর্ট কলেজ)-এ ভর্তি হন। সেখানে তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তৎকালীন সনাতন ও আধুনিক ব্রিটিশ এবং ইউরোপীয় একাডেমিক শিল্পধারার ওপর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর নিখুঁত রেখাঙ্কন শৈলী ও জলরঙের কাজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
১৯৩৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করার বছরেই সর্বভারতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে তাঁর জলরঙে আঁকা বিখ্যাত ‘ব্রহ্মপুত্র নদ’ সিরিজ চিত্রকর্মের জন্য তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এই স্বীকৃতি তাঁকে তৎকালীন ভারতের শিল্পমহলে ব্যাপক পরিচিতি ও সম্মান এনে দেয়। পরবর্তীতে তিনি একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন।
১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ও ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা’
১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ বা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ জয়নুল আবেদিনের শিল্পীসত্তাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি ও মজুদদারদের কৃত্রিম সংকটের কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যান। কলকাতার ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে অনাহারে কাতর, কঙ্কালসার ও মৃতপ্রায় মানুষের যে হৃদয়বিদারক ও অমানবিক দৃশ্য তিনি প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তাঁকে কলম ধরতে বাধ্য করে।
দামি ক্যানভাস বা রঙের অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি সাধারণ সস্তা প্যাকিং কাগজে স্রেফ চীনা কালো কালি ও তুলি ব্যবহার করে এক ঐতিহাসিক রেখাচিত্র সিরিজ তৈরি করেন, যা ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা’ নামে বিশ্বখ্যাত। এই স্কেচগুলোতে মা ও শিশুর মরদেহের পাশে বসে থাকা শকুনের দল, ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ ও অবিচারের এক নির্মম সামাজিক দলিল ফুটে ওঠে। এই ছবিগুলো প্রদর্শিত হওয়ার পর তা বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয় এবং জয়নুল আবেদিনকে আন্তর্জাতিক স্তরে একজন শীর্ষস্থানীয় মানবতাবাদী ও সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার প্রবর্তন ও চারুকলা ইনস্টিটিউট
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর জয়নুল আবেদিন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার কেন্দ্র ছিল না। শিল্পকলাকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি সহকর্মী ও বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে নিয়ে ঢাকায় একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
তাঁর একক ও নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সালের মে মাসে পুরান ঢাকার জনসন রোডের একটি অস্থায়ী ভবনে ‘গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এই নবীন প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটিই ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস’ এবং সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ (ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর হাত ধরেই এ দেশের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক চারুকলা শিক্ষার সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
লোকশিল্প সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য প্রীতি
বাংলার নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতি, কুটির শিল্প ও মৃৎশিল্পের প্রতি জয়নুল আবেদিনের ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত আধুনিক শিল্পকলার মূল শিকড় প্রোথিত থাকে নিজ দেশের লোকশিল্পের গভীরে। গ্রামীণ কারুশিল্পীদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ ও তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে তিনি কাজ শুরু করেন।
তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ, পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ (সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পাশাপাশি, তাঁর নিজস্ব জন্মভূমি ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম সাধারণ মানুষের পরিদর্শনের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গবেষণার সুবিধার্থে ১৯৭৫ সালেই ‘জয়নুল সংগ্রহশালা’ (গ্যালারি) গড়ে তোলা হয়।
উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম ও শিল্পশৈলী
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত শিল্পজীবনে জয়নুল আবেদিন তিন হাজারেরও বেশি স্কেচ, জলরঙ, তেলরঙ ও রেখাচিত্র তৈরি করেছেন। তাঁর শিল্পকর্মে গ্রামীণ জীবনের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, পশুর শক্তি এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থান অত্যন্ত বলিষ্ঠ তুলির টানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে:
দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা (১৯৪৩): মন্বন্তরের বাস্তব ও রূঢ় প্রতিচ্ছবি।
নৌকা (১৯৫৭): বাংলার নদীমাতৃক জীবনের ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য।
সংগ্রাম (১৯৫৯): কাদা থেকে চাকা টেনে তোলার মাধ্যমে মানুষের অদম্য শক্তির প্রতীকী প্রকাশ।
নবান্ন (১৯৬৯): গ্রামীণ উৎসব ও জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি বিখ্যাত স্ক্রলচিত্র।
মনপুরা-৭০ (১৯৭৪): ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও লাশের স্তূপ নিয়ে আঁকা ৩০ ফুট দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক স্ক্রলচিত্র।
বীর মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১) ও ম্যাডোনা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মাতৃত্বের চিরন্তন রূপ।
সম্মাননা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জীবনাবসান
শিল্পকলা, সমাজসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য ও অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জয়নুল আবেদিন জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
১. ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ পদকে ভূষিত করে। ২. সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজের কাছে তিনি তাঁর অসামান্য শিল্পসাধনার কারণে ‘শিল্পাচার্য’ (শিল্পের মহান শিক্ষক) উপাধিতে ভূষিত হন। ৩. ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক শিক্ষাগত পদমর্যাদা ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে নিয়োগ দেয়। ৪. একই বছর (১৯৭৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা আন্দোলনে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ (ডি.লিট) ডিগ্রি প্রদান করে।
১৯৭৬ সালের ২৯ মে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে এই মহান চিত্রশিল্পী ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ভবনের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। জয়নুল আবেদিনের শিল্পচেতনা, আপসহীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং লোকজ সংস্কৃতির প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে পথ দেখিয়ে চলেছে।
