ভিজ্যুয়ালের মহোৎসব: ভাইকিং বেশে বালামের আধ্যাত্মিক গান

বাংলাদেশের আধুনিক পপ ও রক সংগীতের অন্যতম পুরোধা বালামের একটি বহুল প্রতীক্ষিত মিউজিক ভিডিও অবমুক্ত হতে যাচ্ছে। ‘মাওলা’ শিরোনামের এই গানটির দৃশ্যপট ও শৈল্পিক উপস্থাপনা সাজিয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী খ্যাতনামা নির্মাতা তানিম রহমান অংশু। মিউজিক ভিডিওর নির্মাণে নতুনত্ব, চমকপ্রদ ভিজ্যুয়াল এবং নান্দনিক উপস্থাপনার জন্য পরিচিত এই পরিচালক এবার বালামকে দর্শকদের সামনে এক সম্পূর্ণ অচেনা ও চমকপ্রদ ‘ভাইকিং’ বা প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভীয় সমুদ্র অভিযাত্রীর রূপে হাজির করেছেন। গত ঈদুল ফিতরের উৎসবে বালামের যে পঞ্চম একক অ্যালবামটি শ্রোতাদের মাঝে সাড়া ফেলেছিল, সেই অ্যালবামের প্রধান গান বা টাইটেল ট্র্যাক ছিল এই ‘মাওলা’। এবার সেই চমৎকার সৃষ্টিকেই এক আন্তর্জাতিক মানের ও বৃহৎ পরিসরের ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলন ও ট্রেলার উন্মোচন

নতুন এই মিউজিক ভিডিওটির মুক্তি উপলক্ষে গত শনিবার ঢাকা শহরের বনানী এলাকায় অবস্থিত ক্লাব নটর ডেমিয়ানস প্রাঙ্গণে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে গানটির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি চিত্র বা ট্রেলার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদর্শন করা হয়। এই বিশেষ মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের সংগীতাঙ্গনের একঝাঁক শীর্ষস্থানীয় তারকা, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মাইলস ব্যান্ডের হামিন আহমেদ, প্রখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ, কোনাল, এলিটা করিম, আলিফ আলাউদ্দিন, ফারশিদ আলম এবং দেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট কাজী ফয়সাল আহমেদসহ আরও অনেকে। উপস্থিত অতিথিরা ট্রেলারটি দেখার পর এর উচ্চমার্গীয় নির্মাণশৈলী এবং বালামের নতুন রূপের তুমুল প্রশংসা করেন।

করোনা মহামারি ও সৃষ্টির নেপথ্য কথা

সংবাদ সম্মেলনে গানটির সৃষ্টি এবং এর পেছনের মূল ভাবনার কথা অত্যন্ত আবেগহীন ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন বালাম। তিনি জানান যে, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির এক চরম বৈশ্বিক সংকট ও অনিশ্চিত সময়ে এই গানটির জন্ম হয়েছিল। সেই অবরুদ্ধ দিনগুলোতে চারপাশের মানুষের অসহায়ত্ব, মরণব্যাধির ভয় এবং একমাত্র পরম সৃষ্টিকর্তার কাছে আশ্রয় খোঁজার গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি থেকেই তিনি গানটি রচনা ও সুর করতে অনুপ্রাণিত হন।

বালামের বক্তব্য অনুযায়ী, মহামারির সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল যে সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা বা ‘মাওলা’ ছাড়া মানুষের আর কোনো পরিত্রাণ বা উদ্ধারের পথ নেই। এই সত্য উপলব্ধি থেকেই গানটির জন্ম হয়। গানটির মূল বাণী বা লিরিক যৌথভাবে লিখেছেন রশিদ নিউটন এবং বালাম নিজেই। গানটির শুরুই হয় ‘মাওলা মাওলা মাওলা, তুই পানা দেরে মাওলা’—এমন এক গভীর আকুতিভরা চরণের মধ্য দিয়ে, যা মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকে ফুটিয়ে তোলে।

নেপালের কালিনচকে প্রতিকূল দৃশ্যধারণ

এই মিউজিক ভিডিওর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক দৃশ্যপট এবং বালামের পরিধেয় বস্ত্র ও অবয়ব। পুরো গানটির চিত্রধারণ করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালের ‘কালিনচক’ নামক অত্যন্ত দুর্গম, পাহাড়ি ও বরফাবৃত অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতার সেই চরম প্রতিকূল পরিবেশে প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারপাতের মধ্যে ভিডিওর পুরো চিত্রগ্রাহক দলকে কাজ করতে হয়েছে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা এবং উচ্চতাজনিত কারণে তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতার মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও বালামকে সেখানে একজন ভাইকিং অভিযাত্রীর বেশে চমৎকার অভিনয় করতে দেখা গেছে। দীর্ঘায়িত পশমি কোট, রুক্ষ চুল-দাড়ি, প্রাচীন পাহাড়ি আবহাওয়া এবং কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যময় দৃশ্যপট—সব মিলিয়ে দর্শকদের জন্য এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।

নিচে ‘মাওলা’ মিউজিক ভিডিওর প্রধান তথ্যসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

মিউজিক ভিডিওর বিভিন্ন দিকসুনির্দিষ্ট ফ্যাক্ট এবং তথ্য
গানের শিরোনামমাওলা
প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও সহ-গীতিকারবালাম
সহ-গীতিকাররশিদ নিউটন
মিউজিক ভিডিওর পরিচালকতানিম রহমান অংশু
বালামের অ্যালবামের ক্রমপঞ্চম একক অ্যালবাম
ভিডিওর মূল বিষয়বস্তু ও ভাবআধ্যাত্মিকতা এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ
চিত্রধারণের মূল স্থানকালিনচক, নেপাল (উচ্চতা প্রায় আট হাজার ফুট)
বালামের বিশেষ রূপ বা লুকভাইকিং বা অভিযাত্রী
সংবাদ সম্মেলনের স্থানক্লাব নটর ডেমিয়ানস, বনানী, ঢাকা

পরিচালকের পরিকল্পনা ও প্রকাশনা

মিউজিক ভিডিওর পরিচালক তানিম রহমান অংশু জানান যে, ২০২০ সালে গানটি শোনার পরই মূলত এটি নিয়ে বড় বড় ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি এবং অন্যান্য নানাবিধ পারিপার্শ্বিক কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শুটিংয়ের কাজটি পিছিয়ে যায়। কয়েক সপ্তাহ পূর্বে বালাম পুনরায় কাজটি করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে পর্দায় আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। পরিচালকের মতে, বালামের এই ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই অনন্য ভাইকিং রূপ এবং বরফে ঢাকা নেপালের কালিনচকে শুটিং করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। শত প্রতিকূলতার মাঝে পুরো দলের হাড়ভাঙা খাটুনির পর সোমবার মিউজিক ভিডিওটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, যা শ্রোতা ও দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে বলে গানটির পুরো নির্মাণ দল আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।