বাংলাদেশের বীমা খাতে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ক্রমবর্ধমান হওয়ায় খাতের আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জীবন বীমা ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাতটির দুর্বল দিকগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।
বর্তমানে বীমা জালিয়াতি প্রতিরোধ প্রধানত বীমা আইন ২০১০ এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর আওতায় পরিচালিত হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)।
বীমা আইন ২০১০-এর ধারা ১৩০ অনুযায়ী, বীমা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে মিথ্যা তথ্য প্রদান বা জাল নথি দাখিল করলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা, সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া আইডিআরএ প্রয়োগযোগ্য প্রশাসনিক জরিমানা ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। লঙ্ঘনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- অনুমোদন ছাড়া পলিসি ইস্যু করা
- দাবি নিষ্পত্তিতে দেরি করা
- নির্ধারিত নিয়মাবলী অমান্য করা
দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী প্রতারণা (ধারা ৪১৫-৪২০) করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রযোজ্য। নথি জালিয়াতি (ধারা ৪৬৩-৪৬৫) সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। হিসাব জালিয়াতি (ধারা ৪৭৭এ) করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। এছাড়া অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ প্রযোজ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ অননুমোদিতভাবে ব্যবহার বা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। আইডিআরএ কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপ করলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদ্যমান শাস্তি কাঠামো বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত নয়।
আইডিআরএ খাতের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব বিবেচনা করছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
| প্রস্তাবিত পদক্ষেপ | প্রস্তাবের বিস্তারিত |
|---|---|
| পরিচালকের ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত | প্রতারণা প্রমাণিত হলে পরিচালকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা |
| ভোক্তা সুরক্ষা শক্তিশালীকরণ | গ্রাহকের অধিকার ও ক্ষতি প্রতিরোধ বৃদ্ধি |
| নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা সম্প্রসারণ | তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ |
| শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি | জরিমানা ও কারাদণ্ডের সীমা পুনঃনির্ধারণ |
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব প্রস্তাব অংশীজনের মতামতের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার, নিয়মিত তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে খাতটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সঠিক নিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি থাকলে বীমা খাতে গ্রাহক আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
