জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে

বাংলাদেশে হামের বিস্তার নিয়ে নতুন এক গবেষণা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। গবেষণার ফলাফল বিশেষজ্ঞদের সামনে আবারও স্পষ্ট করেছে যে, হাম মোকাবিলায় শুধু টিকাদান নয়, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণাটি চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৫৪ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত হয়। এতে শিশুদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য, পুষ্টিগত অবস্থা, টিকাদানের ইতিহাস এবং পরীক্ষাগারে সংগৃহীত নমুনার ফল বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়, যেখানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতসহ চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণায় দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে ৭১ শতাংশ সরাসরি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বাকি ২৯ শতাংশকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সেখানে পাঠানো হয়। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৫ শতাংশেরও বেশি শিশুর নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা প্রয়োজন হয়েছিল, যা রোগটির জটিলতা ও ঝুঁকির মাত্রা নির্দেশ করে।

পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩০৮ শিশুর পুষ্টিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, ১২ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ছিল। আরও ৫৩ শতাংশ শিশু মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল। অর্থাৎ মোট ৬৫ শতাংশ শিশুর পুষ্টিগত অবস্থা উদ্বেগজনক। অন্যদিকে ৩৪ শতাংশ শিশুর পুষ্টি স্বাভাবিক ছিল এবং মাত্র ১ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় ওজন বেশি পাওয়া গেছে।

অপুষ্টি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে হামের মতো ভাইরাসজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে রোগ থেকে সুস্থ হওয়ার সময়ও তুলনামূলক বেশি লাগে।

গবেষণায় বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ পেত না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হামে মারা যাওয়া ১১ শিশুর মধ্যে ৯ জনই নিয়মিত কেবল বুকের দুধ পেত না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে।

হাম প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্বও গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে। ৩৪২ শিশুর টিকাদান-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স তখনও প্রথম টিকা নেওয়ার উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবে টিকা নেওয়ার বয়স পার হওয়ার পরও ৩৭ শতাংশ শিশু কোনো হাম টিকা পায়নি। মাত্র ১৪ শতাংশ শিশু এক ডোজ এবং ৬ শতাংশ শিশু দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছিল।

হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান

সূচকহার
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশু৩৫৪ জন
সরাসরি হাসপাতালে আসা শিশু৭১%
অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া২৯%
আইসিইউ সেবা প্রয়োজন হয়েছিল৫% এর বেশি
তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত১২%
মাঝারি অপুষ্টিতে আক্রান্ত৫৩%
মোট মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টি৬৫%
স্বাভাবিক পুষ্টি অবস্থা৩৪%
নিয়মিত বুকের দুধ পেত না৩৮%
টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি৪৩%
কোনো হাম টিকা পায়নি৩৭%
এক ডোজ টিকা পেয়েছে১৪%
দুই ডোজ টিকা পেয়েছে৬%

গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। কেন এমন ঘটনা ঘটছে, টিকা যথাসময়ে দেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অন্য কোনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এখনও মূলত বি-৩ ধরনের হামের ভাইরাসই সক্রিয় রয়েছে। গবেষণায় ভাইরাসটির কিছু সামান্য জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হলেও সেটি আগের তুলনায় বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বর্তমান বিস্তারের পেছনে নতুন কোনো ভাইরাসের আবির্ভাব নয়; বরং টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই বড় কারণ।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, দেশে হামের পরিস্থিতি বর্তমানে উদ্বেগজনক। মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৪০ হাজার পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ হাজার কর্মী। এই জনবল সংকটের কারণে সব শিশুকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে, হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। টিকাদানের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, জন্মের পরপরই বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস জোরদার করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং জটিল রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে টিকা গ্রহণের পরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বিষয়ে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর