হেডিংলিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটি ইংল্যান্ডের জন্য ছিল দারুণ সাফল্যের। তবে ২২ গজের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে দিনের সবচেয়ে অভিনব স্মৃতি হয়ে থাকল একটি ক্রিকেট বল। ইংল্যান্ডের দুই পেসার ওলি রবিনসন ও জশ টাং দুজনেই পাকিস্তানের পাঁচটি করে উইকেট নেওয়ার পর ম্যাচের বলটি নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিরল এই ঘটনা ঘটেছে এমন এক ইনিংসে, যেখানে পাকিস্তানের ১০টি উইকেটই তুলে নিয়েছেন এই দুই বোলার।
টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং নেওয়ার পর ইংল্যান্ডকে শুরুতেই সাফল্য এনে দেন রবিনসন। সিরিজের প্রথম বলেই আজান আওয়াইসকে এলবিডব্লিউ করে ফেরান তিনি। এরপর পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদও তাঁর শিকার হন। রবিনসনের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে পাকিস্তানের ওপর শুরুতেই চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮ ওভারে ৫১ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে ইনিংসের অন্যতম সেরা বোলিং করেন তিনি।
অন্য প্রান্তে টাংও ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়ান। পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের শেষ দিকে তাঁর গতি ও বাউন্স সামলাতে পারেননি লোয়ার অর্ডারের ব্যাটাররা। ৯ দশমিক ১ ওভারে ৪৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নেন তিনি। ফলে পাকিস্তানের ইনিংস শেষ হয় মাত্র ১৭১ রানে।
পাকিস্তানের হয়ে আবদুল্লাহ শফিক ও ইমাম-উল-হক কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের ৯১ রানের জুটি দলকে বিপর্যয় থেকে সাময়িকভাবে বের করে আনে। শফিক করেন ৬১ রান, ইমামের ব্যাট থেকে আসে ৪২। কিন্তু ইমামকে টাং ফেরানোর পর পাকিস্তানের ব্যাটিং আবারও ভেঙে পড়ে। শফিককে রবিনসন ফিরিয়ে দেওয়ার পর আর বড় কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৪ রানের মধ্যে শেষ সাত উইকেট হারায় পাকিস্তান।
পাকিস্তানের ইনিংস শেষ হওয়ার পরই আসে দিনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী মুহূর্ত। সাধারণত পাঁচ উইকেট নেওয়া বোলারের জন্য ম্যাচের বলটি একটি বিশেষ স্মারক হিসেবে থেকে যায়। কিন্তু এবার দুজনের অর্জনই ছিল সমান—পাঁচটি করে উইকেট। তাই বলটি কে রাখবেন, সেই প্রশ্নের প্রচলিত সমাধানের বদলে রবিনসনই প্রস্তাব দেন বলটি দুই ভাগ করে নেওয়ার। টাংও তাতে রাজি হয়ে যান। পরে মাঠকর্মীদের সহায়তায় ম্যাচের বলটি পরিষ্কারভাবে দুই টুকরো করা হয়। একটি অংশ রবিনসনের কাছে, অন্যটি টাংয়ের কাছে যায়।
রবিনসনের জন্য এই পাঁচ উইকেটের গুরুত্ব আরও বেশি। দীর্ঘ বিরতির পর ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে ফিরে প্রথম দিনেই তিনি পাঁচ উইকেট পেয়েছেন। সিরিজের প্রথম বলেই উইকেট পাওয়া তাঁর প্রত্যাবর্তনকে আরও স্মরণীয় করে তোলে। এর সঙ্গে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫০০ উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে চোট ও দল থেকে বাদ পড়ার কারণে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর পথটা সহজ ছিল না। তাই হেডিংলির এই পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়াবে।
ব্যক্তিগত জীবনেও রবিনসনের জন্য সময়টি আবেগপূর্ণ। সম্প্রতি তিনি দ্বিতীয়বার বাবা হয়েছেন। নবজাতক কন্যার জন্মের পরপরই জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে এমন পারফরম্যান্স তাঁর কাছে নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যের। নতুন সন্তানের জন্ম, পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং মাঠে ফেরার চাপ—সবকিছুর মাঝেও তিনি যেভাবে বোলিং করেছেন, তা তাঁর মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয়।
একই ইনিংসে ইংল্যান্ডের দুই বোলারের পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনাটিও বিরল। সর্বশেষ ২০০৬ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষেই এমন কীর্তি দেখা গিয়েছিল। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সাইমন হার্মিসন ও মন্টি পানেসার পাঁচটি করে উইকেট নিয়েছিলেন। দুই দশক পর আবার পাকিস্তানের বিপক্ষেই একই ইনিংসে ইংল্যান্ডের দুই বোলার পাঁচ উইকেট করে নিলেন।
দিনের শেষ ভাগে ব্যাট হাতেও ইংল্যান্ড ভালো অবস্থানে ছিল। পাকিস্তানের ১৭১ রানের জবাবে ইংল্যান্ড দিন শেষ করে ২৫ ওভারে ২ উইকেটে ১১২ রান নিয়ে। শুরুতে বেন ডাকেট ও অভিষেককারী এমিলিও গে ৩৬ রানের জুটি গড়েন। পাকিস্তান দ্রুত দুই উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও জো রুট ও জর্ডান কক্স পরিস্থিতি সামলে নেন। রুট ৩৭ রানে অপরাজিত ছিলেন, কক্স অপরাজিত ছিলেন ২৩ রানে। ফলে প্রথম দিন শেষে পাকিস্তানের চেয়ে মাত্র ৫৯ রান পিছিয়ে ছিল ইংল্যান্ড।
এই দিনের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি অবশ্য পরিসংখ্যানে নয়, দুই সতীর্থের মনোভাবেই। দুজনেই যখন সমান পাঁচ উইকেট নিয়েছেন, তখন একজনের কাছে পুরো স্মারক বল রেখে দেওয়ার বদলে তাঁরা অর্জনটাকেই ভাগ করে নিয়েছেন। একটি ক্রিকেট বলের দুই অর্ধ এখন তাই একই ম্যাচে গড়া দুইটি পাঁচ উইকেটের কীর্তির প্রতীক।
ক্রিকেটে এমন স্মারক খুব কমই দেখা যায়। হেডিংলির এই ম্যাচে রবিনসন ও টাং শুধু পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসিয়ে দেননি, নিজেদের জন্য এমন একটি স্মৃতি তৈরি করেছেন, যা তাঁদের দুজনের কাছেই দীর্ঘদিন বিশেষ হয়ে থাকবে।









