খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৩:৩৬ পিএম

বাংলা গানের ভুবনে যে কজন গীতিকার তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম কে জি মোস্তফা। অগণিত কালজয়ী গানের স্রষ্টা হিসেবে তিনি যেমন সমাদৃত, তেমনি ছিলেন একজন সফল সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, সম্পাদক ও সংস্কৃতিসেবী।
১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে তাঁর জন্ম। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি ১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেহাদ-এ শিক্ষানবিশ হিসেবে। একই বছর তিনি দৈনিক মজলুম-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং পত্রিকাটি বন্ধ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৬৮ সালে সাপ্তাহিক জনতা-য় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ কফিলউদ্দীন চৌধুরীর প্রেস সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। একই সময় পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন তাঁকে প্রথম শ্রেণির রেডিও সার্ভিসের জন্য মনোনীত করলেও মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি সেই চাকরিতে যোগ দেননি।
স্বাধীনতার পর তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ, দৈনিক স্বদেশ ও দৈনিক জনপদ-এ গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি সম্পাদনা করেন বিনোদন মাসিক নূপুর।
১৯৭৬ সালে বিলুপ্ত সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের জন্য গঠিত বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারে যোগ দেন। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরে সম্পাদক ও সিনিয়র সম্পাদক পদে উন্নীত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
সরকারি প্রকাশনা জগতে তাঁর অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি কিশোর পত্রিকা নবারুণ, সাহিত্য মাসিক পূর্বাচল, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সংবাদ এবং সচিত্র বাংলাদেশ-এর সম্পাদক হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের মুখপত্র অগ্রদূত-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর কবিতা দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৬০ সাল থেকে চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশনের জন্য তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনা করেন। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। “তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে”, “আমি নেই ভাবতেই ব্যথায় মন ভরে যায়”-সহ অসংখ্য গান আজও বাংলা গানের শ্রোতাদের আবেগে অনুরণিত হয়।
তাঁর গানে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদ, পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রায় সকল খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী। তাঁর গীতিকবিতা প্রেম, প্রকৃতি, মানবিকতা ও জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে।
একসময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণেও যুক্ত হন। মায়ার সংসার, অধিকার এবং গলি থেকে রাজপথ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
কবিতা, গান, ছড়া, প্রবন্ধ ও গদ্য—সাহিত্যের নানা শাখায় ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর জীবন ও সৃজনকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “একজন কে জি মোস্তফা” শীর্ষক গ্রন্থ। এছাড়া বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ, ছড়ার বই ও গদ্যগ্রন্থ রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য, কবিতাপত্র ও সাহিত্য বাংলাদেশ-এর সম্পাদক, দক্ষ পাণ্ডুলিপি সম্পাদক এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংগীতে আজীবন অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন।
২০২২ সালের ৮ মে এই বহুমাত্রিক প্রতিভার অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর লেখা গান আজও মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, স্মৃতি ও অনুভূতির অনন্ত সুর হয়ে বেঁচে আছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রখ্যাত গীতিকার, কবি, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিসেবী কে জি মোস্তফার স্মৃতির প্রতি।
মন্তব্য