কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। রোববার (১৭ মে) দুপুরে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় আয়োজিত এনসিপির এক পদযাত্রা ও যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সমালোচনা করেন। স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সংগঠনের নীতিগত আদর্শ সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই রাজনৈতিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্যে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্যের উল্লেখ করে জানান যে, বিগত মাত্র তিন মাসে কেবল মেঘনা উপজেলাতেই চারটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক এলাকায় এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটার প্রেক্ষিতে তিনি দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও এর কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, যেখানে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলমান রয়েছে, সেখানে জননিরাপত্তার মতো একটি মৌলিক ও স্পর্শকাতর বিষয়ের এমন অবনতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি উপজেলায় তিন মাসে চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা ও সক্ষমতা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে জনসাধারণের মনে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কার্যপদ্ধতি ও জননিরাপত্তা রক্ষায় তাদের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব তথা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিচ্ছেন না। এর পরিবর্তে তিনি অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম ও বিভিন্ন বাহ্যিক বিষয়ে অধিক সময় ও মনোযোগ ব্যয় করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ভিন্নমুখী কার্যক্রমের ফলেই মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রদর্শন করতে পারছে না বলে তিনি দাবি করেন। তিনি অবিলম্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিজেদের মূল আইনি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণের মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
উক্ত অনুষ্ঠানটি মূলত এনসিপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করা, দলের আদর্শ প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছিল। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত যোগদান অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর হাত ধরে স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের এক শতাধিক ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগদান করেন। নতুন এই রাজনৈতিক কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে মেঘনা উপজেলায় দলের সাংগঠনিক অবস্থান ও রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন দলের সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।
মেঘনা উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী এম কে রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পদযাত্রা ও যোগদান কর্মসূচিতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ। এ ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা এই কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে বক্তাগণ স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, এ ধরনের কর্মসূচি তৃণমূল পর্যায়ে দলের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বক্তব্যের শেষাংশে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ পুনরায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসনের পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। মেঘনা উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ধরনের অপরাধমূলক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা কঠোর হস্তে প্রতিরোধে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। একই সাথে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নেতিবাচক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়কে দ্রুত, সমন্বিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য সমাপ্ত করেন।
