খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:৩০ পিএম

তেহরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি সমঝোতার পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল, তখন একই সময়ে ইরানের দুই শীর্ষ আলোচককে হত্যার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, সেই সময় ইসরায়েল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে চলমান আলোচনাই শুধু ভেঙে পড়ত না, বরং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতো।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করা ছিল ইসরায়েলের অন্যতম কৌশল। তবে গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা নিয়ে সংবেদনশীল আলোচনা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করতে থাকেন, আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা আরাগচি ও গালিবাফের ওপর হামলা হলে কূটনৈতিক উদ্যোগ সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নীরবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা ওই দেশগুলোকে ইরানের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কোনো ধরনের হামলার ঝুঁকি দেখা দিলে তা দ্রুত প্রতিহত করা এবং আলোচনার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখা।
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে আরাগচি ও গালিবাফ ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারতেন। কারণ, সে সময় ইসরায়েলের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা ক্ষমতাচ্যুত করার উপযোগী পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। কিন্তু কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যায়। ওয়াশিংটনের মূল্যায়ন ছিল, আলোচনায় যুক্ত নেতাদের হত্যা করা হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে এবং যুদ্ধ নতুন করে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েল সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও অগ্রাধিকারভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করার কৌশল গ্রহণ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে সরিয়ে দেওয়া। এর আওতায় এমন কিছু বাস্তববাদী নেতাও ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা দেখছিল। তাঁদের মধ্যে ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই দুই ব্যক্তিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সন্দেহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্য কিছু ক্ষেত্রে মিল থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুই দেশের অগ্রাধিকার ভিন্ন পথে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সংঘাত সীমিত রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছিল, সেখানে ইসরায়েল যুদ্ধের মাধ্যমে আরও বড় কৌশলগত পরিবর্তন চেয়েছিল। ফলে যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নে দুই মিত্র দেশের অবস্থানে দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি হয়।
এপ্রিলের প্রথম দিকের যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল এবং দেশটির জনমতের একটি অংশের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, খুব দ্রুত যুদ্ধ থেমে গেলে ইরানের সরকার টিকে যাবে এবং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে বলেও বিভিন্ন মার্কিন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়।
আরাগচি ও গালিবাফ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি রূপরেখাভিত্তিক সমঝোতায় পৌঁছায়, যা হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার পথও উন্মুক্ত করে।
তবে ইসরায়েলের নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের একাংশ এই সমঝোতাকে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, এতে ইরানের শাসনব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি, দেশটির প্রক্সি নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভাঙা যায়নি এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও প্রত্যাশিত মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পাশাপাশি তাঁদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান বিপুল আর্থিক সুবিধা পেয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনার কাতারে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখা।
এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্চ মাসের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইসরায়েলের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় আরাগচি ও গালিবাফের নাম ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়ার পর তাঁদের নাম সাময়িকভাবে সেই তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, অন্তত গালিবাফকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অবগত হওয়ার পর ইসরায়েলকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
মন্তব্য