যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দর্শকপ্রিয় বাস্তবভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ (যা সংক্ষেপে ‘এমএএফএস ইউকে’ নামে পরিচিত) এর চিত্রগ্রহণ বা শুটিং চলাকালে একাধিক নারী অংশগ্রহণকারী তাঁদের অন-স্ক্রিন বা নির্ধারিত পুরুষ সঙ্গীদের মাধ্যমে জোরপূর্বক ধর্ষণ ও ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি প্যানোরামার একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী নারীদের চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর এই তথ্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বিশেষ প্রতিবেদনে দুইজন নারী সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন এবং তৃতীয় আরেকজন নারী তাঁর সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক যৌন অসদাচরণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগী এই নারীদের প্রধানতম অভিযোগ হলো, এই বিতর্কিত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজক ও প্রযোজনা কর্তৃপক্ষ অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি এই গুরুতর অভিযোগগুলোর কয়েকটি বিষয় সম্প্রচারকারী চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি দূরদর্শনে প্রদর্শনের পূর্বেই সুনির্দিষ্টভাবে অবগত ছিল। তা সত্ত্বেও ওই আক্রান্ত নারীদের অংশ নেওয়া পর্বগুলো তাদের ডিজিটাল স্ট্রিমিং বা অনলাইন সম্প্রচার সেবায় বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছিল। বিবিসির এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পরপরই গতকাল স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে প্রধান সম্প্রচার মাধ্যম কর্তৃপক্ষ এক জরুরি বিবৃতিতে জানায় যে, তারা তাদের অনলাইন স্ট্রিমিং এবং প্রচলিত দূরদর্শন টেলিভিশন সম্প্রচার সেবা থেকে এই রিয়েলিটি শোর বিতর্কিত পর্বগুলো স্থায়ীভাবে সরিয়ে নিয়েছে। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সকল দাপ্তরিক চ্যানেল থেকেও এই সংক্রান্ত সকল বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এই রিয়েলিটি শোর বিবরণ, আক্রান্ত নারীদের অভিযোগের ধরন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপসমূহ নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| রিয়েলিটি শোর মূল বিবরণ ও সূচকসমূহ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণী |
| অনুষ্ঠানের নাম ও সংক্ষিপ্ত রূপ | ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে (এমএএফএস ইউকে) |
| মূল সম্প্রচারকারী দূরদর্শন চ্যানেল | চ্যানেল ফোর (এবং সহ-প্রতিষ্ঠান বা সিস্টার চ্যানেল ইফোর) |
| অনুষ্ঠানটির বর্তমান প্রচারকাল | বর্তমানে অনুষ্ঠানটির দশম সিজন বা মৌসুম চলমান রয়েছে |
| অনুষ্ঠানের আনুমানিক দর্শক সংখ্যা | ৩০ লাখেরও (ত্রিশ লক্ষ) বেশি নিয়মিত দর্শক |
| অনুষ্ঠান নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান | সিপিএল (একটি স্বাধীন টেলিভিশন প্রযোজনা সংস্থা) |
| তদন্তকারী প্রধান গণমাধ্যম | ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি প্যানোরামা) |
| অভিযোগকারী নারীদের বিবরণ ও সংখ্যা | ৩ জন নারী (২ জন ধর্ষণের এবং ১ জন যৌন অসদাচরণের) |
| কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ গৃহীত আইনি পদক্ষেপ | অনলাইন ও টেলিভিশন থেকে পর্বসমূহ এবং কনটেন্ট অপসারণ |
‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ অনুষ্ঠানটির মূল বিন্যাস বা ফরম্যাট অনুযায়ী, এটি মূলত একটি ‘সাহসী সামাজিক পরীক্ষা’। এই বিশেষ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে একজন অবিবাহিত নারী বা পুরুষ সম্পূর্ণ অপরিচিত অন্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে ‘বিয়ে’ করতে সম্মত হন। এরপর একটি কৃত্রিম বা প্রতীকী বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো তাঁরা একে অপরকে সরাসরি দেখার সুযোগ পান। আয়োজকদের মতে, এই প্রতীকী বিয়ে কোনো আইনি বৈধতা বহন করে না। তবে দর্শকেরা দূরদর্শনের পর্দায় দেখতে পান যে, এই কৃত্রিম দম্পতিরা পরবর্তীতে মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছেন, একই ছাদের নিচে একসঙ্গে বসবাস শুরু করছেন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা জটিল সম্পর্ক সামলানোর চেষ্টা করছেন। এই সকল কর্মকাণ্ডই দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ক্যামেরার সামনে ধারণ করা হয় এবং তাদের প্রায় প্রতিদিনের জীবনযাপন দর্শকদের বিনোদনের জন্য প্রচার করা হয়। এই অনুষ্ঠানে অনেকে নিজের সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার জন্য অংশ নেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত খ্যাতি বা পরিচিতি পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন।
বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে তিনজন নারী নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, তাঁরা সবাই শোতে তাঁদের জন্য নির্ধারিত পুরুষ সঙ্গীর বিরুদ্ধে আইনি ও नैतिक বা নৈতিক অসদাচরণের অভিযোগ এনেছেন। এই নারীদের মধ্যে কেবল একজন স্বেচ্ছায় নিজের নাম প্রকাশ করেছেন, যাঁর নাম শোনা ম্যান্ডারসন। তিনি ২০২৩ সালের সিরিজে অংশ নিয়েছিলেন। শোনা ম্যান্ডারসন বিবিসিকে বলেন, “আপনি একটি রিয়েলিটি দূরদর্শন শোতে অংশ নিচ্ছেন বলেই আপনাকে এমন পাশবিক ঘটনার শিকার হতে হবে, তা আমি কোনোভাবেই মনে করি না।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, অনুষ্ঠানটির প্রধান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিপিএল-এর উচিত অবিলম্বে মানুষের এভাবে ক্ষতি করা বন্ধ করা। এই সিপিএল মূলত একটি স্বাধীন টেলিভিশন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, যারা চ্যানেল ফোর-এর জন্য এই রিয়েলিটি শোটি নির্মাণ করে থাকে।
বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম অভিযোগকারী নারীর ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছে লিজি। তিনি জানান, অনুষ্ঠানের শুরুতেই তাঁর জন্য নির্ধারিত অন-স্ক্রিন বা কৃত্রিম স্বামীর আচরণে তীব্র মানসিক সমস্যা ও উদ্বেগজনক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল। মধুচন্দ্রিমার সময় তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্তে ওই ব্যক্তি প্রায়ই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন এবং তীব্র রাগে ফেটে পড়তেন। ক্যামেরার বাইরে লিজিকে তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী জানিয়েছিলেন যে, তিনি ও তাঁর সাবেক সঙ্গী অতীতের সম্পর্কে একে অপরের প্রতি অত্যন্ত ‘নৃশংস’ আচরণ করতেন। লিজির অভিযোগ অনুযায়ী, একদিন রাতে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের সোফায় তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী তাঁর অসম্মতিতে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। লিজি যখন তাঁকে বাধা দেন এবং থামতে বলেন, তখন ওই ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, “তুমি না বলতে পারো না, তুমি আমার স্ত্রী।” এরপর লিজিকে এই ঘটনা কারও কাছে প্রকাশ করলে অ্যাসিড নিক্ষেপ বা অ্যাসিড হামলা চালানোর সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। পরদিন সকালে লিজি শোর ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণ দলকে বিষয়টি জানান এবং তাঁর শরীরের কালশিটে দাগের ছবি তুলতে দেন। কিন্তু বাস্তবতার অনুভূতি হারিয়ে ফেলা এবং শোর মানসিক চাপে তিনি শুটিং চালিয়ে যান। পরবর্তীতে অনুষ্ঠানটি যখন প্রচার হতে থাকে, তখন তিনি মানসিকভাবে চরমভাবে ভেঙে পড়েন এবং প্রযোজককে বার্তা পাঠিয়ে জানান যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবীরা এই ধর্ষণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, সকল শারীরিক সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই হয়েছিল এবং কোনো ধরনের অ্যাসিড হামলার হুমকি দেওয়া হয়নি। লিজি এখন এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দ্বিতীয় অভিযোগকারী নারী, যাঁর ছদ্মনাম ক্লোই, তিনি জানান যে একদিন ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর অন-স্ক্রিন স্বামী তাঁর সঙ্গে তীব্র যৌন অসদাচরণ শুরু করেন। তিনি চিৎকার করে বাধা দেওয়া সত্ত্বেও ওই ব্যক্তি থামেননি। ক্লোই তাৎক্ষণিকভাবে কল্যাণ দলের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন এবং লিজির মতোই মানসিক অবশতার কারণে সিরিজ শেষ করা পর্যন্ত শুটিং চালিয়ে গিয়েছিলেন। শুটিং সমাপ্ত হওয়ার পর ক্লোই যখন শোর প্রধান মনোরোগ-বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করে পুরো ঘটনাটি বিস্তারিত জানান, তখন ওই বিশেষজ্ঞ স্পষ্ট করে বলেন যে, তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই আচরণটি আইনগতভাবে ধর্ষণের শামিল। ক্লোই-এর অন-স্ক্রিন স্বামীর আইনজীবীরাও এই অভিযোগের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
তৃতীয় নারী হিসেবে অভিযোগ তোলা শোনা ম্যান্ডারসন ক্যামেরার সামনে জানান, তাঁর অন-স্ক্রিন সঙ্গীর আচরণ ধীরে ধীরে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণমূলক হয়ে উঠেছিল এবং একপর্যায়ে তা যৌন সম্পর্কের সকল স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে। তিনি চ্যানেল ফোর কর্তৃপক্ষের প্রতি এই শোর অভ্যন্তরীণ কল্যাণ ব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যায়নের জন্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বাইরে থেকে তদন্তকারী বা অডিটর নিয়োগ করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই শোর ফরম্যাটের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই ধরনের সামাজিক রিয়েলিটি শো আদৌ দূরদর্শনে সম্প্রচারে থাকা উচিত নয়।” শোনা আরও উল্লেখ করেন যে, নারীরা অনেক সময় সমাজ ও লজ্জাবোধের কারণে নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না, কারণ তারা নিজেদেরই অপরাধী মনে করতে শুরু করেন। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়টি বুঝতে এবং তা স্বীকার করতে তাঁদের অনেক সময় লেগে যায়।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যের সৃজনশীল শিল্প খাতের নতুন সরকারি তদারকি সংস্থার চেয়ারম্যান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে’ অনুষ্ঠানের মূল কাঠামোটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি স্পষ্ট যে অনুষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অংশগ্রহণকারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সঠিক ও কার্যকর কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। যদিও এর আগে চ্যানেল ফোর এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিপিএল এই সকল অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছিল এবং অংশগ্রহণকারীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সার্বক্ষণিক মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা দেওয়ার দাবি করেছিল, তবে শেষ পর্যন্ত জনরোষ ও আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে তারা অনুষ্ঠানটির পর্বসমূহ প্রচার মাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ করতে বাধ্য হয়েছে।
