খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ১১:১ পিএম

ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ভার সামাল দিতে গিয়ে গভীর সংকটে পড়েছেন অস্ট্রেলিয়ার তরুণরা। নিত্যদিনের খরচ মেটাতে গিয়ে জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের অনেকেই এখন নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার মতো অত্যন্ত জরুরি পরিকল্পনাগুলো স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তরুণদের একটি বড় অংশ ঝুঁকছেন ঋণের দিকে, কেউ কেউ আবার বেছে নিচ্ছেন অতিরিক্ত পার্ট-টাইম কাজ বা সাইড হাসল। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিমা প্রতিষ্ঠান ‘আইএজি’ (IAG) পরিচালিত দেশব্যাপী এক সাম্প্রতিক জরিপে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রথম ‘আইএজি রেজিলিয়েন্ট ফিউচারস রিপোর্ট’ এবং ‘আইএজি রিস্ক ইনডেক্স’-এর অংশ হিসেবে মোট ২,৪০০ জন নাগরিকের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। এতে মূলত বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলায় জনমানুষের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও ঝুঁকির মাত্রা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়ের কারণে তরুণরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। জরিপে বিভিন্ন প্রজন্মের অর্থনৈতিক ও মানসিক আচরণের একটি তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে, যা নিচে দেওয়া হলো:
প্রজন্মভিত্তিক আর্থিক সংকট ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা
| বিষয়ের বিবরণ | জেনারেশন জেড (Gen Z) | মিলেনিয়ালস (Millennials) | বেবি বুমার্স (Baby Boomers) |
| চিকিৎসা সেবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্থগিত | তথ্য উপলব্ধ নয় | ৪৭.৭ শতাংশ | তথ্য উপলব্ধ নয় |
| খরচ মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা | তথ্য উপলব্ধ নয় | ৪৫.৫ শতাংশ | তথ্য উপলব্ধ নয় |
| অতিরিক্ত কাজ বা সাইড হাসল গ্রহণ | ৬০.৫ শতাংশ | তথ্য উপলব্ধ নয় | তথ্য উপলব্ধ নয় |
| ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ বা ইতিবাচকতা | উচ্চ মাত্রার আশাবাদ | উচ্চ মাত্রার আশাবাদ | ৪৬.১ শতাংশ (জাতীয় গড় ৫৬.৭%) |
| আর্থিক নিরাপত্তা বলয় (Financial Buffer) | বেশ দুর্বল বা কম | বেশ দুর্বল বা কম | তুলনামূলক মজবুত ও সুরক্ষিত |
| ঝুঁকি মোকাবিলায় সুরক্ষামূলক প্রস্তুতি | অপর্যাপ্ত | অপর্যাপ্ত | তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো |
জরিপের উপাত্ত থেকে স্পষ্ট যে, খরচের লাগাম টানতে গিয়ে প্রায় অর্ধেক (৪৭.৭%) মিলেনিয়াল তরুণ তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল বা পিছিয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি এই প্রজন্মের ৪৫.৫ শতাংশ তরুণকে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ধারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, জেনারেশন জেডের তরুণদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি (৬০.৫%) বাড়তি আয়ের আশায় মূল কাজের পাশাপাশি অন্য কোনো খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হয়েছেন।
এর বিপরীতে প্রবীণ বা ‘বেবি বুমার্স’ প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ কিছুটা কম (৪৬.১ শতাংশ) দেখা গেলেও, তাদের পর্যাপ্ত সঞ্চয় বা আর্থিক নিরাপত্তা বলয় রয়েছে। ফলে যেকোনো আকস্মিক সংকট বা ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে তারা তরুণদের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত অবস্থানে আছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিগত এক বছরে অস্ট্রেলিয়ার ৬৭ শতাংশ সাধারণ ভোক্তা এবং ৬৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত (SME) বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা সামাজিক স্থবিরতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এত প্রতিকূলতার মাঝেও তরুণদের মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিক দৃঢ়তা ও ইতিবাচকতা লক্ষ্য করা গেছে। সমস্ত সংকট সত্ত্বেও ৫৮ শতাংশ সাধারণ ভোক্তা এবং ৭২ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও বেশ আশাবাদী।
আইএজি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও নিক হকিন্স জানান, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দাভাব সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে। এর ফলে মানুষের দৈনন্দিন খরচ যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে জমানো অর্থও।
ব্যবসায়িক খাতের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়াও এখন ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অন্যতম প্রধান বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১২ মাসে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি শিকার হয়েছেন দেশের ৪৮ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তবে এত বড় ঝুঁকির মধ্যেও ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা রক্ষা করার পরিকল্পনা (Business Continuity Planning), বিকল্প সরবরাহ চেইন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত বিমা পলিসি পর্যালোচনা করার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে এখনও বড় ধরনের প্রস্তুতিমূলক ঘাটতি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
মন্তব্য