ময়মনসিংহ নগরীতে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ আট দিন পর এক প্রথম শ্রেণির স্কুলছাত্রীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (২৯ জুন) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বয়রা ফকির বাড়ি এলাকার একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকা ও নিহতের পরিবারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের স্পষ্ট দাবি, শিশুটিকে নৃশংসভাবে নির্যাতন করে হত্যার পর ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হতে পারে।
মর্মান্তিক এই ঘটনার শিকার শিশুটির নাম সাউমী সাবা (৬)। সে বয়রা ফকির বাড়ি এলাকার বাসিন্দা স্বপন ফকিরের মেয়ে এবং স্থানীয় বয়রা ছালাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
স্কুল থেকে ফিরে নিখোঁজ ও দীর্ঘ প্রতীক্ষা
পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিল ছোট্ট সাউমী সাবা। এরপর দুপুর ২টার দিকে বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে সে দুই প্রতিবেশী শিশুর সঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে এবং খেলাধুলা করতে ঘর থেকে বের হয়। বেশ কিছু সময় পার হওয়ার পর ওই দুই শিশু নিজেদের বাড়িতে ফিরে এলেও সাউমী সাবা আর ঘরে ফেরেনি।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলেও মেয়ে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। তারা পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িসহ আশপাশের সম্ভাব্য সব জায়গায় হন্যে হয়ে খোঁজ করেন। কিন্তু কোথাও সাবা’র কোনো সন্ধান মেলেনি। কোনো উপায় না পেয়ে নিখোঁজের ওই দিন রাতেই শিশুটির বাবা স্বপন ফকির কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ আট দিন ধরে পরিবারটি তাদের আদরের সন্তানের ফেরার পথ চেয়ে প্রহর গুনছিল।
বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময় মরদেহ উদ্ধার
ঘটনার আট দিন পর সোমবার বিকেল ৪টার দিকে বয়রা সমাধানের মোড় এলাকায় একটি ডোবার কালভার্টের নিচে এক ব্যক্তি বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন। হঠাতই তিনি পানির ওপর একটি শিশুর মরদেহ ভাসতে দেখে চিৎকার শুরু করেন। তার চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ ও নিখোঁজ সাউমী সাবার পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। আট দিন পানির নিচে থাকায় মরদেহটি বিকৃত হয়ে গেলেও নিখোঁজের সময় শিশুটির পরনে থাকা জিন্স প্যান্ট দেখে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত হন যে এটিই তাদের হারিয়ে যাওয়া সাউমী সাবা। পরে খবর দেওয়া হলে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহটি পানি থেকে উদ্ধার করে।
হত্যা নাকি দুর্ঘটনা: পরিবার ও পুলিশের দ্বিমুখিতা
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই এটি হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা—তা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। নিহত শিশুর মামা বেলায়েত হোসেন অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত ২১ জুন বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে সাবা নিখোঁজ হয়েছিল। আমরা অনেক খুঁজেছি, থানায় জিডিও করেছি। আজ যখন ডোবা থেকে ওর লাশ তোলা হলো, তখন আমরা স্পষ্ট দেখেছি ওর পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতনের কালো দাগ রয়েছে। আমার ভাগনিকে কোনো পাষণ্ড পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে প্রমাণ লোপাটের জন্য এই ডোবায় ফেলে দিয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অন্যদিকে, কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে বিকেলে ডোবা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় শরীরের চামড়া নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আট দিন আগে যখন তীব্র বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন খেলাধুলার ছলে শিশুটি কালভার্টের নিচে গভীর পানিতে পড়ে গিয়ে ডুবে মারা যায়।
ওসি আরও যোগ করেন, “মরদেহের ময়নাতদন্ত করার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই কেবল মৃত্যুর প্রকৃত ও সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব হবে। পরিবারের অভিযোগটি আমরা মাথায় রাখছি। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু বা নিয়মিত মামলা দায়েরসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”









