রবীন্দ্রনাথের গানের সুরে যাঁর কণ্ঠে মিশে যায় মায়া, মমতা, আবেগ ও এক অনির্বচনীয় আবেশ—রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেই আপন শিল্পী শ্রাবণী সেন আজ জন্মদিনে পদার্পণ করছেন। দুই বাংলার অসংখ্য সংগীতপ্রেমীর কাছে তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক নিবেদিত সাধক। বিশেষ এই দিনে কাঁটাতারের এপার থেকে প্রিয় শিল্পীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অফুরান শুভকামনা।
সংগীতের ঐতিহ্যবাহী এক পরিবারে শ্রাবণী সেনের বেড়ে ওঠা। তিনি প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুমিত্রা সেনের কন্যা এবং জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ইন্দ্রাণী সেনের ছোট বোন। শৈশব থেকেই তাঁর চারপাশে ছিল গান, সুর ও সংগীতচর্চার আবহ। তবে পারিবারিক উত্তরাধিকার তাঁকে পথ দেখালেও নিজের শিল্পীসত্তা নির্মাণে তিনি নির্ভর করেছেন মেধা, অধ্যবসায়, দীর্ঘ সাধনা ও স্বতন্ত্র সংগীতবোধের ওপর।
শ্রাবণী সেন একাধারে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী, সংগীত শিক্ষিকা ও সাংবাদিক। কলকাতার পাঠভবন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস কলেজ থেকে ভূগোলে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সংগীতজগতে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগের আগে কিছু সময় সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ‘মনোরমা’ পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি শৈশবে তবলা বাজানোর প্রতিও তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায় সংগীত। অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে গানের জগতে প্রবেশ করলেও শৈশব থেকেই সংগীতের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর প্রথম ও প্রধান সংগীতগুরু ছিলেন মা সুমিত্রা সেন। পরবর্তীতে গীতবিতানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আনুষ্ঠানিক তালিম নেন তিনি। দীর্ঘ অনুশীলন, নিষ্ঠা ও গভীর সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় তাঁর নিজস্ব গায়কী।
দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রকাশিত তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম ‘আমার একটি কথা’ ও ‘বন্ধু রহো সাথে’ শ্রোতামহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বহু একক অ্যালবাম। রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে শ্রাবণী সেনের বিশেষত্ব হলো—তিনি ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রেখেও নিজের অনুভব ও স্বতন্ত্র পরিবেশনভঙ্গির মাধ্যমে গানগুলোকে শ্রোতাদের কাছে নতুন করে পৌঁছে দিয়েছেন।
তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত তাই একই সঙ্গে পরিচিত ও নতুন মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের চিরন্তন বাণীর সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের আবেগ মিশে তৈরি করে এক নিজস্ব আবহ। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, শব্দ ও সুরের আড়ালে শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতিও যেন নীরবে কথা বলে ওঠে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও শ্রাবণী সেনের রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিচিতি। চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’ চলচ্চিত্রে ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু। এরপর ‘দেখা’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’, ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’, ‘বালিগঞ্জ কোর্ট’, ‘হেমন্তের পাখি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা গেছে।
২০০০ সালে ‘উৎসব’ চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার জন্য বিএফজেএ-এর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ মহিলা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এই স্বীকৃতি তাঁর চলচ্চিত্রসংগীতের যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক গানেও শ্রাবণী সেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি। দুই বাংলার শ্রোতাদের পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিরাও তাঁর গানে খুঁজে পেয়েছেন আপন মাটির গন্ধ, পরিচিত আবেগ ও শিকড়ের টান।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৯ সালে তাঁকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞান নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেও তিনি কাজ করে চলেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘শ্রাবণী সেন মিউজিক একাডেমি’, যার মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা ও চর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
শ্রাবণী সেনের শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে কেবল পরিবেশন করেন না; বরং গানগুলোর আবেগ, দর্শন ও অন্তর্নিহিত অনুভূতিকে নিজের কণ্ঠের মাধ্যমে শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে দেন। তাঁর গানে যেমন থাকে শাস্ত্রীয় অনুশাসন ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, তেমনি থাকে একান্ত নিজস্ব অনুভবের কোমল স্পর্শ।
তাঁর কণ্ঠে যখন ভেসে আসে—
“তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা…”
তখন মনে হয়, গান কেবল শোনার বিষয় নয়; গান অনুভবেরও বিষয়। একটি কণ্ঠ কীভাবে স্মৃতি, আবেগ, ভালোবাসা ও নস্টালজিয়াকে একসূত্রে বাঁধতে পারে, শ্রাবণী সেনের গান তারই অনন্য উদাহরণ।
কাঁটাতারের সীমারেখা মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসাকে কখনো ভাগ করতে পারে না। ভাষা, সংস্কৃতি ও সংগীতের বন্ধন সেই সীমারেখার বহু ঊর্ধ্বে। তাই দুই বাংলার অগণিত সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ে শ্রাবণী সেন আজও সমানভাবে আপন, সমানভাবে প্রিয়।
আজ ১৪ আগস্ট, প্রিয় এই শিল্পীর জন্মদিনে কাঁটাতারের এপার থেকে জানাই জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অফুরান ভালোবাসা।
আপনার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আরও বহু বছর ধরে অনুরণিত হোক। আপনার সুরের মায়ায় ভরে উঠুক অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়। জীবনের প্রতিটি দিন হোক আনন্দ, সুস্থতা, সৃষ্টিশীলতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিল্পী শ্রাবণী সেন।
আপনার সুরের ভুবনে আমাদের পথচলা হোক আরও দীর্ঘ, আরও মুগ্ধতাময়। আপনার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের অমর গান নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে পৌঁছে যাক বারবার।
অফুরান শুভকামনা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।









