জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

তিন জাতির পিতার মৃত্যু ও জাতিসত্তার নির্মম ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—তিন নেতার নাম রাষ্ট্র ও জাতিসত্তার বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তা ছিল ভিন্ন; তাঁদের মৃত্যুর ঘটনাও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু আততায়ীর গুলিতে নিহত হন, আর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলেও জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল অসুস্থতা, নিঃসঙ্গতা ও অব্যবস্থাপনার এক বেদনাদায়ক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও উদ্বাস্তু সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। সেই সময় গান্ধী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। দিল্লিতে অবস্থানকালে তিনি মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দাবিতে অনশন করেন। পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থের ৫৫ কোটি রুপি ভারত সরকারকে দেওয়ার পক্ষে তাঁর অবস্থানও তৎকালীন রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লির প্রার্থনাসভায় যাওয়ার সময় নাথুরাম গডসের গুলিতে তিনি নিহত হন। গডসে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করতেন।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে একদল সেনাসদস্যের অভ্যুত্থান ও সশস্ত্র হামলায় বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নানা বিরোধের মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটিতে পরিণত হয়।

জিন্নাহর শেষ পরিণতি ছিল ভিন্ন ধরনের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে বেলুচিস্তানের জিয়ারতে অবস্থানকালে তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও অবনতি হয়। পরে তাঁকে কোয়েটায় নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

১১ সেপ্টেম্বর করাচিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন জিন্নাহ। সেদিন তাঁকে বহনকারী ‘ভাইকিং’ উড়োজাহাজ করাচিতে অবতরণ করে। তাঁর আগমনকে ঘিরে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল। বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না। অসুস্থ জিন্নাহকে স্ট্রেচারে করে বিমান থেকে নামিয়ে একটি সামরিক অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সটি বিকল হয়ে যায়।

অসুস্থ রাষ্ট্রপ্রধানকে তখন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বর্ণিত ঘটনাগুলোতে জানা যায়, প্রচণ্ড গরমে তিনি অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিলেন এবং তাঁর মুখে মাছি বসছিল। নার্স ডানহাম তাঁকে সেবা করার পাশাপাশি মাছি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। পরে আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স এলে তাঁকে গভর্নমেন্ট হাউসে নেওয়া হয়। সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা এই নেতা শেষ সময়ে ছিলেন অত্যন্ত শারীরিকভাবে দুর্বল এবং প্রায় নিঃসঙ্গ।

তিন নেতার মৃত্যুর এই তিনটি ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গল্প নয়; এগুলো দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ও জাতিসত্তার বিকাশের জটিল ইতিহাসও সামনে আনে। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অহিংসা ও বহুত্ববাদ। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে। আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।

এখানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বাতন্ত্র্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় ও পাকিস্তানি জাতীয়তার বিকাশে ভূখণ্ড, রাজনৈতিক পরিচয় ও ধর্মের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ভাষা ও সংস্কৃতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি পর্যায়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয় রাজনৈতিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

মানুষ স্থান পরিবর্তন করতে পারে, দেশান্তরিত হতে পারে, এমনকি ধর্মও পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মুছে ফেলা যায় না। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, পাশ্চাত্য সাহিত্য ও ইংরেজি ভাষার গভীর প্রভাবও তাঁর ওপর ছিল; তবু তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যিক সৃষ্টির অন্যতম ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা ভাষাতেই রচিত হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।

তাই গান্ধী, জিন্নাহ ও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুকে একই রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক ছাঁচে বিচার করা কঠিন। গান্ধীর মৃত্যু ছিল সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভয়াবহ পরিণতি; জিন্নাহর মৃত্যু ছিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই এক অসুস্থ ও ক্লান্ত রাষ্ট্রনায়কের নিঃসঙ্গ বিদায়; আর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সংঘটিত এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

তিন নেতার জীবন ও মৃত্যুর দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—জাতিরাষ্ট্রের জন্ম কখনোই কেবল রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারণের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ভূখণ্ড, আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। সেই বৃহত্তর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে গান্ধী, জিন্নাহ ও বঙ্গবন্ধুর করুণ পরিণতি দক্ষিণ এশিয়ার জাতিসত্তার উত্থান, রাষ্ট্র নির্মাণ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার এক গভীর ও বেদনাময় প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।

Tags :

Ratul

Recent News