বাংলা কথাসাহিত্যে আধুনিকতার স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণে যেসব সাহিত্যিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, কথাসাহিত্যিক রশীদ করিম তাঁদের অন্যতম। গভীর জীবনবোধ, সমাজ ও সময়ের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, মানুষের অন্তর্গত টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের জটিলতাকে সহজ অথচ ব্যঞ্জনাময় ভাষায় তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। নির্মেদ, সাবলীল ও কাব্যিক দ্যোতনাময় গদ্যভাষার জন্য তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য শিল্পী।
কবি শামসুর রাহমান রশীদ করিমের সাহিত্যিক প্রতিভার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাঁকে দেশের অন্যতম সেরা গদ্যকার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। বিশেষ করে তাঁর ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাসের ভাষার সহজতা, সরলতা ও আধুনিকতা শামসুর রাহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রশীদ করিম ছিলেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ও প্রিয় বন্ধু।
১৯২৫ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রশীদ করিম। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সেখানেই। দেশভাগের পর তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে একটি তেল কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে পেশাগত ব্যস্ততা কখনো তাঁর সাহিত্যসাধনাকে আড়াল করতে পারেনি। চাকরির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান সাধনা।
রশীদ করিমের সাহিত্যজীবনের সূচনা ছোটগল্প দিয়ে। ১৯৪২ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর গল্প ‘আয়েশা’। একই সময়ে প্রকাশিত ‘একটি মেয়ের আত্মকাহিনী’ গল্পটিও পাঠক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। গল্পটির প্রশংসা করেছিলেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু। শুরুর দিকের এই স্বীকৃতি তরুণ রশীদ করিমের সাহিত্যিক আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।
তবে বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর স্থায়ী আসন তৈরি করে দেয় ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাস। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে ভারতভাগের অস্থিরতা, দেশত্যাগের বেদনা, মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব এবং পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার গভীর প্রতিফলন ঘটেছে। ব্যক্তিজীবনের অনুভূতি ও বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতাকে একসূত্রে গেঁথে রশীদ করিম এই উপন্যাসে নির্মাণ করেন এক শক্তিশালী কথাশিল্প। ‘উত্তম পুরুষ’-এর জন্য তিনি লাভ করেন আদমজী পুরস্কার। এর মধ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
রশীদ করিমের সাহিত্যভাণ্ডার ছিল বৈচিত্র্যময়। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে—‘প্রসন্ন পাষাণ’, ‘আমার যত গ্লানি’, ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’, ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’, ‘এ কালের রূপকথা’, ‘সোনার পাথরবাটি’, ‘বড়ই নিঃসঙ্গ’, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’, ‘চিনি না’, ‘পদতলে রক্ত’ ও ‘লাঞ্চ বক্স’। এসব রচনায় কখনো উঠে এসেছে মানুষের ব্যক্তিগত সংকট, কখনো সমাজের পরিবর্তন, আবার কখনো সময়ের নির্মম অভিঘাতে বদলে যাওয়া মানুষের জীবন ও মানসিকতা। তাঁর প্রকাশিত সর্বশেষ গ্রন্থ আত্মজীবনী ‘জীবনমরণ’।
উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প ও প্রবন্ধ রচনাতেও রশীদ করিম রেখেছেন অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সঙ্গে মিশে গেছে সময়ের বাস্তবতা। মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্ব, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, ভালোবাসা ও একাকিত্বকে তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর গদ্যের বড় শক্তি ছিল ভাষার স্বাভাবিকতা। জটিল জীবনবোধকে তিনি এমন সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করতেন, যা পাঠকের কাছে একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও গভীর হয়ে উঠত।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননায়। তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, লেখিকা সংঘ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। এসব স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যিক কৃতিত্বেরই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
তবে জীবনের শেষ অধ্যায়ে রশীদ করিম অনেকটাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতির বিপরীতে ব্যক্তিজীবনের শেষ সময়টি কেটেছে অনেকটা নীরবতা ও একান্তে। ফলে তাঁর মৃত্যুর সংবাদও যেন সেই নীরবতার মধ্যেই এসে পৌঁছেছিল।
২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা কথাসাহিত্যের এই শক্তিমান শিল্পী। তাঁর প্রস্থান বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটায়। কিন্তু একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের মতোই রশীদ করিমও তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মৃত্যুকে অতিক্রম করে গেছেন।
তাঁর উপন্যাসের চরিত্র, মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, সমাজ ও সময়কে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহজ অথচ গভীর গদ্য আজও পাঠককে আকৃষ্ট করে। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়; কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্য মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে তার আবেদন কখনো পুরোনো হয় না।
রশীদ করিম ছিলেন সময়ের নিবিড় পর্যবেক্ষক, মানুষের মনের সূক্ষ্ম পাঠক এবং বাংলা গদ্যের এক মেধাবী কারিগর। তিনি শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন; বাংলা কথাসাহিত্যের আধুনিক বিকাশে তিনি এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নির্মাতা।
আজ তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করছি এই নিভৃতচারী কথাশিল্পীকে গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছাক—এই হোক তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।









