নড়াইল জেলার সদর উপজেলার কোড়গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষকেরা চরম আর্থিক ও শ্রম সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, জ্বালানি তেলের অপ্রাপ্যতা এবং বাজারে ধানের কম দামের কারণে কৃষকেরা তাদের কষ্টে ফলানো ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
কোড়গ্রামের কৃষক প্রলাদ বিশ্বাস জানান, বর্তমানে বাজারে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার নয়শ টাকা দরে, অথচ একই পরিমাণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় তেরো শত টাকা। তিনি বলেন, সময়মতো সার না পাওয়া, সেচ ও শ্রমিকের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনের সংকট কৃষকদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
একই এলাকার কৃষক শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস চার বিঘা জমির ধান কাটার সময় জানান, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়ে বারো শত টাকা হয়েছে এবং তাদের তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, সেচ ও পুনরায় চাষাবাদের জন্য ডিজেল সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেক সময় জ্বালানি তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হয় এবং শহর থেকে আনতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয়।
এ বছর কৃষকদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিচের তথ্য থেকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—
| বিষয় | গত বছর | চলতি বছর |
|---|---|---|
| প্রতি বিঘা উৎপাদন খরচ | ১২,৫০০ টাকা | ১৮,০০০ টাকা |
| শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি | তুলনামূলক কম | প্রায় ৩০০ টাকা বেশি |
| প্রতি মণ ধান উৎপাদন খরচ | প্রযোজ্য নয় | ১,৩০০ টাকা |
| বাজারে বিক্রয় মূল্য | প্রায় ১,০০০–১,৯০০ টাকা | একই |
সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠজুড়ে কৃষকেরা ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো এবং ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। অনেকেই ঋণের বোঝা মেটাতে ধান ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের অংশ হিসেবে সরবরাহকৃত কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন যথাযথভাবে মাঠে ব্যবহার না হওয়ায় কৃষকেরা পুনরায় শ্রমনির্ভর পদ্ধতিতে ধান কাটছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকটি মেশিন বরাদ্দ থাকলেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না বলে জানা যায়।
আনন্দ বিশ্বাস ও মিতালী দম্পতি জানান, তারা বর্গা জমিতে চার বিঘা ধান আবাদ করেছেন এবং দিনমজুরির পাশাপাশি কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তারা জানান, শ্রমিকের অভাবে নিজেদের হাতেই ধান কাটতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, এখনো সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কৃষকেরা বাজারমূল্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জন্য লোকসানজনক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় পাঁচ হাজার দুইশ সাতানব্বই হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার ছয়শ তেইশ মেট্রিক টন। চলতি সময়ে প্রায় আট শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে কৃষকেরা ন্যায্য দামে ধান বিক্রির সুযোগ পাবেন।