দীর্ঘ আট মাস ব্যাপী নানামুখী চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে পর্দা নেমেছে দেশের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের। ১০ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় বরাবরের মতোই গোলদাতার তালিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছেন বিদেশি ফুটবলাররা। লিগের শেষ দিনে আরামবাগকে ৪-০ গোলে হারিয়ে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ঢাকা আবাহনী লিমিটেড। তবে এক রাউন্ড হাতে রেখেই আসরের শিরোপা নিশ্চিত করেছিল আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস।
Table of Contents
গোলদাতাদের পরিসংখ্যান ও বিদেশিদের দাপট
এবারের আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষ তিনটি স্থানই দখল করে নিয়েছেন বিদেশি রিক্রুটরা। বসুন্ধরা কিংসের ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দরিয়েলতন গোমেজ ১৯ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। ১৩ গোল নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ফর্টিস এফসির গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড ওমর বাবু। তৃতীয় স্থানে থাকা ঢাকা আবাহনীর মালির স্ট্রাইকার সুলেমান দিয়াবাতে আসর শেষ করেছেন ১১ গোল নিয়ে।
স্থানীয় ফুটবলারদের পারফরম্যান্স এক্ষেত্রে তুলনামূলক নিষ্প্রভ। ঘরোয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬টি করে গোল করেছেন বসুন্ধরা কিংসের ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও ঢাকা আবাহনীর শেখ মোরছালিন। এছাড়া আল আমিন ও রাকিব হোসেনের পা থেকে এসেছে ৩টি করে গোল। গোলদাতার তালিকার চতুর্থ স্থানে ৭টি করে গোল করে যৌথভাবে অবস্থান করছেন চারজন বিদেশি খেলোয়াড়।
বিপিএল ২০২৪: শীর্ষ গোলদাতার তালিকা
| অবস্থান | খেলোয়াড়ের নাম | দেশ | ক্লাব | গোলের সংখ্যা |
| ১ম | দরিয়েলতন গোমেজ | ব্রাজিল | বসুন্ধরা কিংস | ১৯ |
| ২য় | ওমর বাবু | গাম্বিয়া | ফর্টিস এফসি | ১৩ |
| ৩য় | সুলেমান দিয়াবাতে | মালি | ঢাকা আবাহনী | ১১ |
| ৪র্থ (যৌথ) | চারজন বিদেশি খেলোয়াড় | বিভিন্ন | বিভিন্ন | ০৭ (প্রতিটি) |
| স্থানীয় সেরা | ফয়সাল আহমেদ ফাহিম | বাংলাদেশ | বসুন্ধরা কিংস | ০৬ |
| স্থানীয় সেরা | শেখ মোরছালিন | বাংলাদেশ | ঢাকা আবাহনী | ০৬ |
অতীত মৌসুমের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের শীর্ষ লিগে বিদেশি গোলদাতাদের এই আধিপত্য দীর্ঘদিনের একটি ধারা। বিগত মৌসুমগুলোতেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি।
বিগত মৌসুম: ঘানার ফরোয়ার্ড স্যামুয়েল বোয়াটেং রহমতগঞ্জের হয়ে খেলে ২১ গোল করে শীর্ষস্থান দখল করেছিলেন। সেবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯ গোল ছিল মোহামেডানের সুলেমান দিয়াবাতের।
২০২৩-২৪ মৌসুম: এই মৌসুমেও শীর্ষ তিন গোলদাতার সবাই ছিলেন বিদেশি। সেন্ট ভিনসেন্টের কর্নেলিয়াস স্টুয়ার্ট ১৯ গোল, সুলেমান দিয়াবাতে ১৭ গোল এবং দরিয়েলতন গোমেজ ১৪ গোল করেছিলেন।
লিগের প্রতিকূলতা ও ব্যবস্থাপনা
এবারের লিগ আয়োজনে বাফুফেকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং জাতীয় নির্বাচনের কারণে লিগ বারবার দীর্ঘ বিরতির কবলে পড়ে, যার ফলে এটি সম্পন্ন করতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছে। ঢাকার বাইরের চারটি ভেন্যুতে খেলা হলেও মাঠের গুণগত মান নিয়ে ফুটবলারদের মধ্যে অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করা গেছে। মাঠের প্রতিকূলতা খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও এএফসি লাইসেন্সিং জটিলতা
লিগ শেষ হলেও এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের টিকিট প্রাপ্তি নিয়ে বর্তমানে একটি নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের এই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার কথা। তবে বসুন্ধরা কিংস এবং ঢাকা আবাহনী লিমিটেড—উভয় ক্লাবের ওপরই ফিফার খেলোয়াড় নিবন্ধনের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
এএফসি ক্লাব লাইসেন্সিংয়ের কঠোর নিয়মাবলী এবং ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় এই দুই ক্লাব অংশ নিতে না পারলে ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হওয়া ফর্টিস এফসি ও পুলিশ এফসিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় দলের প্রস্তুতি
ঘরোয়া আসর শেষ হতে না হতেই জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে অংশ নেবে বাংলাদেশ। এই ম্যাচকে সামনে রেখে জাতীয় দলের নতুন কোচ টমাস ডুলি ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে প্রস্তুতি ক্যাম্প শুরু হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিদেশিদের দাপটে লিগ শেষ হলেও এখন সকলের নজর জাতীয় দলের আসন্ন আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সের দিকে।
