খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুন ২০২৬, ৮:৪২ পিএম

দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের ভেতরে দুই রোগীর মধ্যে সহিংস মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে চিকিৎসাধীন এক মানসিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত ২ জুন গভীর রাতে হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতরে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাজানি হলে হাসপাতালজুড়ে এবং স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার পর হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ওয়ার্ডের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে রোগীর স্বজন ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসনের নথিপত্র এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia) নামক গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত দুই যুবককে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের একজন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খোঁজাখালি গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল ইসলাম (২৮) এবং অন্যজন ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হক (২৬)। রোগের তীব্রতা ও ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উভয়কেই হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে।
ভর্তির ওই দিন গভীর রাতে অর্থাৎ রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ওই ওয়ার্ডের ভেতরে দুই রোগীর মধ্যে হঠাৎ করেই তীব্র মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে নাজমুল ইসলামের উপর্যুপরি আঘাতে মাথায় গুরুতর জখম পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইনজামুল হক। এই সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় অপর রোগী নাজমুল ইসলাম নিজেও গুরুতরভাবে আহত হন।
নিচে ঘটনার বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং আইনি পদক্ষেপের তথ্য সংক্ষেপে একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও ফ্যাক্টস |
| ১. | নিহত রোগীর নাম ও পরিচয় | ইনজামুল হক (২৬ বছর), পিতা- মৃত গোলাম নবী, ঝিনাইদহ। |
| ২. | অভিযুক্ত রোগীর নাম ও পরিচয় | নাজমুল ইসলাম (২৮ বছর), পিতা- আব্দুল মালেক, সিরাজগঞ্জ। |
| ৩. | আক্রান্ত রোগের ধরন | সিজোফ্রেনিয়া (উভয় রোগী)। |
| ৪. | ঘটনার স্থান ও সময় | অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ড, পাবনা মানসিক হাসপাতাল; ২ জুন, রাত ৩:০০ ঘটিকা। |
| ৫. | মামলা দায়েরের বিবরণ | ৩ জুন, পাবনা সদর থানা (বাদী: নিহতের ভাই ইজাজুল হক)। |
| ৬. | তদন্তকারী কর্মকর্তা ও থানা | ওসি তরিকুল ইসলাম, পাবনা সদর থানা। |
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক বাদী হয়ে গত ৩ জুন পাবনা সদর থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেন। হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে ইজাজুল হক প্রশ্ন করেন, “যে ছেলেটা আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, সেও তো মানসিক রোগী। এমন দুজন রোগীকে তারা কিভাবে একসঙ্গে রাখল? যখন তারা মারামারি করছিল, তখন কেন কেউ থামাতে পারল না?” অন্যদিকে, অভিযুক্ত রোগী নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর হাসপাতালের কর্তব্যরত লোকজন তার ছেলেকে অন্যায়ভাবে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক ও সেবামূলক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে নার্সিং সুপারিন্টেনডেন্ট রেখা আক্তার জানান, অনেক সময় মানসিক রোগীদের বাহ্যিকভাবে দেখে স্বাভাবিক মনে হলেও তারা হঠাৎ করে চরম সহিংস আচরণ শুরু করতে পারে। এমন আকস্মিক ও সহিংস পরিস্থিতিতে ওয়ার্ডে কর্তব্যরত অল্পসংখ্যক নারী নার্সের পক্ষে উত্তেজিত রোগীকে শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালে পুরুষ সেবাকর্মীর (Male Attendant) তীব্র সংকট রয়েছে এবং মানসিক রোগীদের সামলানোর জন্য কর্মীদের আলাদা কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা প্রদান করা হয় না।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ ওয়ার্ডের ভেতরে মারামারি ও রোগীর মৃত্যুর সত্যতা স্বীকার করে জানান, যে দুই রোগী মারামারিতে লিপ্ত হয়েছিলেন তারা পূর্বেও এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অত্যন্ত গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটার কারণে কর্তব্যরত কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেননি।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম মামলার অগ্রগতির বিষয়ে বলেন, যেহেতু এজাহারভুক্ত মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেও একজন প্রত্যয়িত মানসিক রোগী, তাই মামলা দায়েরের পর পুলিশি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিজ্ঞ আদালত এবং মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আইনি নির্দেশনা বা করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট মতামত জানার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য