দ্রুত সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করছে ইরান

সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুতগতিতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করছে ইরান। গত এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে তেহরান পুনরায় ড্রোন উৎপাদন শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ইতিমধ্যে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, উৎক্ষেপণ যন্ত্র এবং অস্ত্র কারখানাগুলো সচল করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, পুনরুদ্ধারের এই গতি ওয়াশিংটনের প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি। যেখানে ধারণা করা হয়েছিল ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়েছে, সেখানে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই দেশটি তাদের ড্রোন হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবে বলে মনে করছেন এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের জন্য ইরানের এই ড্রোন সক্ষমতা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামরিক সক্ষমতা ও ক্ষয়ক্ষতির বর্তমান চিত্র

অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-এর মাধ্যমে ইরানের সমরাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের ৯০ শতাংশ ধ্বংস করার দাবি করেছিলেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন এই দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটির এই ক্ষতি দেশটিকে বড়জোর কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই কয়েক বছর নয়।

নিচে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও বর্তমান অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সামরিক খাতবর্তমান অবস্থা ও পুনরুদ্ধারের তথ্য
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্রএপ্রিলের হামলায় ৫০% টিকে ছিল, বর্তমানে যা বেড়ে ৬৬% (দুই-তৃতীয়াংশ) হয়েছে।
ড্রোন (UAV) সক্ষমতাপ্রায় ৫০% বা কয়েক হাজার ড্রোন এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।
উপকূলীয় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রএই খাতের একটি বড় অংশ অক্ষত; যা হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অস্ত্র কারখানাপুনরায় সচল করা হচ্ছে; চীনের সহায়তায় যন্ত্রাংশ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
পুনরুদ্ধার সময়সীমাআগামী ৬ মাসের মধ্যে ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা।

বিদেশি সহায়তা ও কৌশলগত সুবিধা

ইরানের এই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে রাশিয়া ও চীনের সমর্থনকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, চলমান সংঘাতের মধ্যেও চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে গেছে। যদিও চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন যে, বেইজিং থেকে তেহরানে সমরাস্ত্রের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে।

এছাড়া, মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে সরবরাহ কিছুটা সীমিত হলেও ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পকে ব্যবহার করে মাটিচাপা পড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত উৎক্ষেপণ যন্ত্রগুলো উদ্ধার ও মেরামতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন হামলার কেন্দ্রবিন্দু মূলত ইরানের জাহাজের দিকে থাকায় উপকূলীয় প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ইরানকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ৮ এপ্রিল থেকে বিরতি চললেও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়ে রেখেছেন। ট্রাম্পের মতে, শান্তিচুক্তি না হলে তিনি যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় বোমা হামলা শুরু করতে পারেন।

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল অবশ্য মার্কিন বাহিনীর শক্তিমত্তার ওপর জোর দিয়ে জানিয়েছেন যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অভিযান চালানোর সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, ইরান যদি দ্রুত তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা গুছিয়ে নিতে পারে, তবে পরবর্তী দফায় যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। দ্রুত সামরিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ইরান মূলত এটিই প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি যথেষ্ট শক্তিশালী।