দেশের দুইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে মোট ১৪১ জন শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব নিয়োগে ভুয়া সনদ, জাল নিয়োগ বোর্ড, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের সনদ জালিয়াতির মতো বিভিন্ন প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মোট ১৩৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৮ জনের নিয়োগ অবৈধ। অন্যদিকে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে মোট ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগ অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অনিয়মের সারসংক্ষেপ
| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম | মোট শিক্ষক | অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক | প্রধান অনিয়ম |
|---|---|---|---|
| সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় | ১৩৩ জন | ৬৮ জন | জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ, আর্থিক অনিয়ম |
| বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ | ৭৬ জন | ৭৩ জন | জাল সনদ, পারিবারিক নিয়োগ, ঘুষ |
সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াও ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া বেসরকারি বেতন খাতে যথাক্রমে প্রায় ৯৭ লাখ টাকা ও প্রায় ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়। আরও প্রায় ৩৮ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অনিয়মিতভাবে প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন কেনাকাটা, জেনারেটর ও লিফট ক্রয়, মেরামত কাজ এবং অভিভাবক শেড নির্মাণেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত তহবিল থেকে বিভিন্ন লিজিং কোম্পানিতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়, যা বিধিসম্মত নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যান্টিন ভাড়া ও ল্যাপটপ ক্রয় সংক্রান্ত তথ্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব নিয়োগের অধিকাংশ সনদ জাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নিজেও জাল সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ পেয়েছেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ গ্রহণ করেছেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন-ভাতার মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যা ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ ও অনিয়মের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন থাকলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বড় পরিসরে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সনদ যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
