মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা শুরু করেছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জর্ডানের আল আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই ঘটনার কিছু সময় পর কুয়েত জুড়েও চরম সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে শোনা যায়। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বুধবার (১০ জুন) সকালে তারা কঠিন জ্বালানি চালিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জর্ডানের ওই ঘাঁটিতে সফল আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য, জর্ডানের আল আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসদস্যদের স্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে এবং সেখানে মার্কিনিদের অত্যন্ত অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা আছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জর্ডানের অভ্যন্তরে হামলার সময় কোনো ধরনের সতর্কতামূলক সাইরেন বাজেনি।
অন্য এক বিবৃতিতে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সম্ভাব্য বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় দেশটিতে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হচ্ছে। কুয়েত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেশের সাধারণ নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুয়েত সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের যেকোনো সম্ভাব্য আকাশযান বা ধেয়ে আসা লক্ষ্যবস্তুসমূহকে প্রতিহত করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একই সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কুয়েত সরকার ও সামরিক বাহিনীর দেওয়া নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র সরকারি তথ্যের ওপর পূর্ণ নির্ভর করতে দেশের জনসাধারণের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে।
জর্ডান ও কুয়েতের এই ঘটনার পূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি দেশ বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটিতেও অত্যন্ত জোরালো হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ভৌগোলিকভাবে পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর এই পঞ্চম নৌবহরের স্থায়ী সদর দপ্তর ও সামরিক কার্যালয় অবস্থিত। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন এই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখনো বাহরাইনের রাজধানীতে ব্যাপক মাত্রায় হামলা চালিয়েছিল ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক এই চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, যখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনীই ওই হেলিকপ্টারটি আকাশ থেকে ভূপাতিত করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রপতির এই দাবির পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা কেন্দ্রীয় কমান্ড সরাসরি ইরানের উপকূলবর্তী বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় ব্যাপক সামরিক বিমান হামলা পরিচালনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিমান হামলার জের ধরেই মূলত আজ বুধবার সকালে ইরান জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে এই পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ও আক্রান্ত অঞ্চলসমূহের বিবরণ নিচের তালিকায় সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | আক্রান্ত বা সতর্ক অবস্থানে থাকা দেশ ও অঞ্চল | ঘাঁটির বিবরণ ও মজুত থাকা সামরিক সরঞ্জাম | গৃহীত ব্যবস্থা বা বর্তমান পরিস্থিতি |
| ১ | জর্ডান (আল আজরাক ঘাঁটি) | মার্কিন সেনাসদস্য এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান | ইরানের কঠিন জ্বালানি চালিত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা |
| ২ | কুয়েত (দেশব্যাপী) | কুয়েতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সদর দপ্তর | সতর্কতামূলক সাইরেন এবং নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ |
| ৩ | বাহরাইন (সদর দপ্তর এলাকা) | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের প্রধান কার্যালয় | ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কর্তৃক পূর্ববর্তী ও বর্তমান হামলা |
| ৪ | হরমুজ প্রণালি (উপকূলীয় অঞ্চল) | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি সামরিক হেলিকপ্টার ধ্বংসের স্থান | মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের পাল্টা বিমান হামলা এবং সংঘাতের সূচনা |
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বর্তমানে চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এবং মার্কিন ও ইরানি সামরিক বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো গভীর পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।
