খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই নভেম্বর ২০২৫, ৬:৫ পিএম

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় গরু চোর সন্দেহে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে নিহত তিন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। নিহতরা সকলেই পার্শ্ববর্তী বগুড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান শুরু করেছে।
Table of Contents
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার (২১ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে উপজেলার কাটাবাড়ি ইউনিয়নের নাসিরাবাদ (মাজার এলাকা) গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। ওই গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আব্দুস ছালামের গোয়ালঘর থেকে ৮-১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র তিনটি গরু চুরি করার চেষ্টা চালায়।
গরু নিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ির মালিক টের পেয়ে চিৎকার শুরু করলে গ্রামের কয়েকশ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বেরিয়ে আসে। গ্রামবাসীর ধাওয়া খেয়ে চক্রের অধিকাংশ সদস্য তাদের সাথে থাকা পিকআপ ভ্যান নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তিন সদস্য পিছু হটে একটি পুকুরে লাফিয়ে পড়ে। ক্ষিপ্ত জনতা পুকুর থেকে তাদের টেনে হিঁচড়ে ওপরে তুলে বেধড়ক মারধর শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই দুইজনের মৃত্যু হয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তৃতীয় ব্যক্তিকে পুলিশ উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তারও মৃত্যু ঘটে।
নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তারা হলেন:
১. কাউসার (৫০): পিতা- আলেব্বর আলী, গ্রাম- দামগাছা বুড়িগঞ্জ, শিবগঞ্জ, বগুড়া।
২. বুলবুল (৩৮): পিতা- আক্কাস আলী, গ্রাম- উত্তরপাড়া সিহালী, শিবগঞ্জ, বগুড়া।
৩. শাহীনুর (৩১): পিতা- আব্দুল হাকিম, গ্রাম- সাহাপাড়া হেরুঞ্জ, দুপচাঁচিয়া, বগুড়া।
নিচে উক্ত অপ্রীতিকর ঘটনার মূল তথ্যগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত বিবরণ |
| ঘটনার স্থান | নাসিরাবাদ গ্রাম, কাটাবাড়ি ইউনিয়ন, গোবিন্দগঞ্জ |
| তারিখ ও সময় | রোববার ভোররাত (২১ ডিসেম্বর), আনুমানিক ২:৩০ টা |
| নিহতের সংখ্যা | ০৩ জন |
| মামলার বিবরণ | এসআই মো. তফিজ উদ্দীন কর্তৃক অজ্ঞাতনামা মামলা |
| আসামির সংখ্যা | ২৫০ থেকে ৩০০ জন (অজ্ঞাতনামা) |
| আইনি পদক্ষেপ | ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর |
| তদন্ত কর্মকর্তা | ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম |
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ থানার দায়িত্বরত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. তফিজ উদ্দীন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ২৫০ থেকে ৩০০ জন গ্রামবাসীকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
ওসি বলেন, “চুরির অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। আমরা ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ঘটনার সাথে জড়িত মূল উস্কানিদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গোবিন্দগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে গরু চুরির উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। চোর চক্রের সদস্যরা পিকআপ ভ্যান ব্যবহার করে গভীর রাতে অভিযান চালায় এবং অনেক সময় অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শন করে। কৃষকদের সারা বছরের একমাত্র সম্বল গরু চুরি হওয়ায় প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল, যার বহিঃপ্রকাশ এই মর্মান্তিক গণপিটুনির ঘটনা।
তবে আইন বিশ্লেষক ও সচেতন মহল মনে করছেন, বিচারহীনতা কিংবা নিরাপত্তার অভাবে জনতা যেভাবে সহিংস হয়ে উঠছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বিচার ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। চুরির বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা জরুরি।
বর্তমানে নাসিরাবাদ এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে গ্রামের পুরুষ সদস্যরা অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
মন্তব্য