খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছে, যেখানে দেশ-বিদেশের অতিথি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় আয়োজনের এই কর্মসূচিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকানুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুক্রবার ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে তাঁর সঙ্গে নিহত অন্যদের মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়। দেশটির বৃহত্তম জুমার নামাজের এই প্রাঙ্গণের প্রধান নামাজকক্ষে মরদেহগুলো রাখা হয়। এরপর শুরু হয় আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন। সেখানে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিনিধি, ইসলামি আলেম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি সম্মান জানান।
প্রথম দিকের বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা ছিলেন। ইরানে স্বীকৃত বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এর মাধ্যমে দেশটির বহুমাত্রিক ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা দেখা গেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, শেষবিদায়ের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি তেহরানে পৌঁছাচ্ছেন। অন্তত আটজন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী কিংবা বিশেষ দূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও শোকানুষ্ঠানে অংশ নেবেন। পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকারি প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তবে যেসব ইউরোপীয় দেশ ইরানের দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে, তাদের এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বজনেরা উপস্থিত হয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশবাসীর প্রতি শোকানুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এমন উপস্থিতি দেশের জনগণের সংহতি এবং রাষ্ট্রের আদর্শের প্রতি আনুগত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, কয়েক দিনব্যাপী এই দাফন ও শোকানুষ্ঠানে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। এত বিপুল মানুষের সমাগম ঘটলে এটি দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শোকসমাবেশে পরিণত হবে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার ও রোববার গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। এরপর সোমবার তেহরানে একটি শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পবিত্র শহর কুমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের পর ইরাকের বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফে স্মরণসভা আয়োজন করা হবে। সবশেষে আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।
ইরানের সরকারি বর্ণনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে শোকের আবহ সৃষ্টি হয় এবং দাফন প্রক্রিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক উপস্থিতি ও ধর্মীয় আয়োজনের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য