জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

ক্ষমতার মধুচক্রে স্বেচ্ছাচারিতা করা কে এই নেত্রী?

ক্ষমতার মধুচক্রে অনেকেই অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন নানা কারণে। ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু মানুষের বলয় তৈরি হয়। তেমনি আওয়ামী লীগের টানা ও দীর্ঘ ১৬ বছরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে দলটির শাসনামলের শেষ প্রান্তে এসে ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে এমন সব চরিত্রের আগমন ঘটে, যারা ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। আওয়ামী লীগের এই ক্ষমতা বলয়েরই এরকম এক জ্বালাময়ী ছাত্রনেত্রী মাশতুরা মোশাররফ ঐষিকা। যিনি ছিলেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি।

যিনি ছাত্রলীগের নেত্রী হলেও যার ক্ষমতার দৌড় ছিল একেবারে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, নিয়ন্ত্রণ করতেন উত্তরবঙ্গ আওয়ামী লীগের বেশ কিছু জেলা ও মহানগরের রাজনীতিও। যার আঙুলের ইশারায় বহিষ্কার হয়ে যেতেন ছাত্রলীগের নেতারা, আবার পদ পেতেন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও।

মাশতুরা মোশাররফ ঐষিকা তার ক্ষমতা গড়ে তুলেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমানের কথিত ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ পরিচয়ে। এ ঘনিষ্ঠতার পরিচিতি ছিল ফরিদপুরের রাজনীতি থেকে তাঁর জন্মশহর দিনাজপুর কিংবা রংপুর জেলা-মহানগরেও। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে রাজনীতি থেকে ‘নিখোঁজ’। তার খোঁজ আর কেউ জানে না।

দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, আবদুর রহমানের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ স্বামী পরিচয় নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের উত্তরবঙ্গের রংপুর-দিনাজপুরের রাজনীতিতে নেতাকর্মীদের পদ-পদবি নিয়ে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কথাকাটাকাটির পরই অব্যাহতি

সজিব আহমেদ তখন অভিযোগ করেছিলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমানের জন্মদিনের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় দুই নেতার নাম বারবার না বলায় তিনি প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাশতুরা মোশাররফ ঐষিকার সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয় এবং এর জেরেই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সজিব।

সজিব আরও বলেছিলেন, তিনি ১২ বছর ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কারণ না জানিয়ে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া অন্যায় বলেও তখন অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

তবে সজিবের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন ঐষিকা। তার ভাষ্য ছিল, তার সঙ্গে তর্কের জেরেই সজিবকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় দুই নেতার নাম বলা হয়েছিল দাবি করে ঐষিকা বলেন, সজিব এ নিয়ে অভিযোগ করার সময় উগ্র আচরণ করেছিলেন।

ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তামজিদুল রশিদ চৌধুরীও তখন বলেছিলেন, মেডিকেলের এক কর্মীর সঙ্গে সজিবের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে বলে তিনি জানতেন। তবে ঐষিকার সঙ্গে সজিবের বাগ্‌বিতণ্ডার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছিলেন।

রংপুর-দিনাজপুরে ‘পদ-বাণিজ্যের’ অভিযোগ

ঐষিকাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ছিল আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, আবদুর রহমানের ‘দ্বিতীয় স্ত্রীর’ পরিচয়-প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন ঐষিকা।

ফরিদপুরের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি মাশতুরা মোশাররফ ঐষিকার বিরুদ্ধে রংপুর ও দিনাজপুরের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতার দাবি, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি বিভিন্ন জেলা ও মহানগর কমিটিতে পদ-পদবি পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাতেন।

রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য অভিযোগ করেন, ঐষিকার ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে’ রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের একটি অংশ পরিচালিত হতো। তার ভাষ্য, মহানগর আওয়ামী লীগে কে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসবেন, কে বাদ পড়বেন, এমনকি বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে কার অবস্থান শক্ত হবে, এসব বিষয়েও ঐষিকার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।

ওই নেতা বলেন, “মহানগর আওয়ামী লীগে কে পদে আসবে, কে আসবে না, সেটাও ঠিক করতেন তিনি। তার কথার বাইরে গিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল।” তার দাবি, শুধু রংপুর মহানগর নয়, দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগেও ঐষিকাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, আবদুর রহমানের সঙ্গে ঐষিকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিচয়কে ব্যবহার করেই এই প্রভাব তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ তাকে আবদুর রহমানের ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে আবদুর রহমানের সঙ্গে ঐষিকার বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রকাশ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, আবদুর রহমানের রাজনৈতিক প্রভাবকে সামনে রেখে তার কথিত স্বামীকে ব্যবহার করে বিভিন্ন কমিটিতে পদ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হতো। বিশেষ করে রংপুর জেলা, রংপুর মহানগর এবং দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের পদ-পদবি নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী।

তাদের অভিযোগ, কাঙ্ক্ষিত পদ পাওয়ার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং পরে প্রভাবশালী নেতাদের কাছে সুপারিশ পৌঁছানোর একটি প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় আবদুর রহমানের নাম ও রাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের ওই আহ্বায়ক কমিটির সদস্যের দাবি, “ঐষিকার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে সবকিছু চলত। কে কমিটিতে ঢুকবে, কে বাদ যাবে, সেটি নিয়েও তার প্রভাব ছিল। দিনাজপুরেও তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।”

তার অভিযোগ, এই প্রভাবের কারণে তৃণমূলের অনেক আওয়ামী লীগ নেতা নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা থেকে বঞ্চিত মনে করতেন। দলীয় পদ-পদবি নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনীতির বদলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

স্থানীয় নেতাদের আরও অভিযোগ, আবদুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে রেখে ঐষিকার ঘনিষ্ঠ একটি বলয় তৈরি হয়েছিল। ওই বলয়ের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের কোণঠাসা মনে করতেন। আবদুর রহমানের সঙ্গে ঐষিকার সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত নানা পরিচয়ও তার প্রভাব বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগ তাদের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান ও ঐষিকার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর