জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুলাই ২০২৬, ৫:২৩ পিএম

ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে হত্যা মামলায় স্বামী মনোজিত সরকারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামি মনোজিত সরকার আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এ কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলার একই অভিযোগে অভিযুক্ত মনোজিতের ছয় স্বজনকে অবশ্য বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। অভিযোগের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় বিপুল সরকার, সরজিৎ সরকার, লিটন সরকার, বিপ্লব সরকার, সবুজ সরকার ও দীপালী সরকারকে খালাস দেওয়া হয়।
মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জারজননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের সময় রমার পরিবারের পক্ষ থেকে যৌতুক হিসেবে চার লাখ টাকা, সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণ এবং প্রায় ৫০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এসবের পরও যৌতুকের দাবি থামেনি। বরং রমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করেন তার বাবা।
ঘটনার আগে ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল মনোজিত আরও এক লাখ টাকা দাবি করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দাবি পূরণ না হওয়াকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে রমার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ২০ এপ্রিল বিকেলে রমাকে গলায় নাইলনের সুতা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। মনোজিত মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন এবং রমার পরিবারের সদস্যদের জানান, পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে শ্বাসরোধে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়।
এরপর ২০১৮ সালের ১০ মে রমার বাবা রঞ্জন বিশ্বাস বাদী হয়ে মধুখালী থানায় মামলা করেন। মামলায় মনোজিত সরকারসহ তার ছয় স্বজনকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে আসামি করা হয়। বাদীর অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকেই রমাকে যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়া এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হতো। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার আশায় পরিবার একাধিকবার অর্থসহ বিভিন্ন সামগ্রী দিলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
মামলার তদন্ত শেষে মধুখালী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক মাহাবুল করিম ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত মনোজিত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেন। তবে বাকি ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।
রায়ের মাধ্যমে প্রায় সাত বছর ধরে চলা এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হলো। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।
রায়ের পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, যৌতুক এখনো সমাজের একটি ভয়াবহ ব্যাধি। যৌতুকের দাবিতে কোনো নারীকে নির্যাতন বা হত্যা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রমা বিশ্বাস হত্যার এই মামলাটি যৌতুকপ্রথার কারণে নারীর ওপর নির্যাতনের ভয়াবহ পরিণতির একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। আদালতের রায়ে একদিকে যেমন হত্যার দায়ে স্বামীর শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ছয় স্বজনকে খালাসও দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলার রায়ে আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে।
মন্তব্য