ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজের গোলাবর্ষণ এবং ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্যের জলসীমার কাছাকাছি ইংলিশ চ্যানেলে একটি ব্রিটিশ পতাকাবাহী বেসামরিক ইয়টকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গোলাবর্ষণ করেছে রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ এবং ‘বেপরোয়া’ আচরণ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তবে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই ঘটনার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের তরফ থেকে রাশিয়ার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।

ঘটনার স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাজ্যের আইল অফ উইট থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে আন্তর্জাতিক জলসীমায়। এই গোলাবর্ষণের সত্যতা যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়—উভয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। ঘটনার সময় ওই আন্তর্জাতিক নৌপথে রাশিয়ার ‘অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ’ নামের একটি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছিল এবং বেসামরিক পক্ষ হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিল ‘ব্রাইট ফিউচার’ নামের একটি ব্রিটিশ ইয়ট, যাতে একজন ব্রিটিশ দম্পতি ভ্রমণ করছিলেন।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ও ব্যাখ্যা

ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী:

  • সংঘর্ষের আশঙ্কা: রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ‘অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ’-এর সঙ্গে ব্রিটিশ দম্পতিকে বহনকারী ইয়ট ‘ব্রাইট ফিউচার’-এর একটি আকস্মিক সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

  • যোগাযোগে ব্যর্থতা: সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর জন্য রুশ নাবিকরা বারবার ইয়টটির সঙ্গে রেডিও বা অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা তাতে ব্যর্থ হন।

  • সতর্কতামূলক পদক্ষেপ: নৌ দুর্ঘটনা ও সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর লক্ষ্যেই কেবল রুশ যুদ্ধজাহাজ থেকে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়। ইয়টটিকে সরাসরি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য কোনো লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি বলে মস্কো দাবি করেছে।

ব্রিটিশ দম্পতির পাল্টা বক্তব্য ও রুশ দাবি প্রত্যাখ্যান

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন আক্রান্ত ইয়টে থাকা ওই ব্রিটিশ দম্পতি। নৌযানটিতে অবস্থানকারী এই প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান যে, তাদের বেসামরিক ইয়টটি কোনোভাবেই রুশ যুদ্ধজাহাজের গতিপথের সামনে ছিল না এবং কোনো ধরনের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার মতো অবস্থানেও সেটি ছিল না। রাশিয়ার এই আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যাকে তারা ‘চিরাচরিত মিথ্যাচার’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ও ট্যাঙ্কার প্রসঙ্গ

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই সমগ্র ঘটনাটিকে একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সম্প্রতি গত রোববার যুক্তরাজ্যের সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাশিয়ার একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার বা শ্যাডো ফ্লিট জব্দের ঘটনার পর এই গোলাবর্ষণ ঘটায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই ধারণা করছিলেন যে ট্যাঙ্কার জব্দের প্রতিশোধ হিসেবে রাশিয়া এই আচরণ করেছে। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই ধরনের সব জল্পনা নাকচ করে দিয়ে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে যে, পূর্ববর্তী ট্যাঙ্কার জব্দ এবং মঙ্গলবারের এই গোলাবর্ষণের ঘটনার মধ্যে কোনো ধরনের কোনো যোগসূত্র বা সম্পর্ক নেই।

জি-৭ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বক্তব্য

ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই ঘটনার বিষয়ে তার সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি জানান যে, ইংলিশ চ্যানেলে ইয়টকে লক্ষ্য করে রুশ যুদ্ধজাহাজের এই গোলাবর্ষণের ঘটনাটি নতুন কোনো রহস্যজনক বা ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংকটের ইঙ্গিত দেয় না।

তবে কিয়ার স্টারমার বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, ইউক্রেন রাষ্ট্রটির ওপর রাশিয়ার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই দীর্ঘ সময় ধরে পুরো ইউরোপীয় অঞ্চলজুড়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বিভিন্ন আগ্রাসী এবং বেপরোয়া কার্যক্রম ও বৈরিতা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পুরোপুরি স্পষ্ট।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কড়া নজরদারি ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ

আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নিয়ম ও নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুযায়ী, ইংলিশ চ্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ অতিক্রম করার সময় রাশিয়ার যেকোনো যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক নৌযানের ওপর ব্রিটিশ নৌবাহিনী সর্বদা কড়া নজরদারি বজায় রাখে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, মঙ্গলবারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সময়ও ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঘটনার মুহূর্তে রয়্যাল নেভির বা ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দূরदर्शी যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস মার্সি’ ওই আন্তর্জাতিক জলসীমায় উপস্থিত থেকে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ‘অ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ’-এর গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছিল।

সামগ্রিক পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র

ঘটনার উপাদানসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য
ঘটনার স্থানআইল অফ উইট থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে, আন্তর্জাতিক জলসীমা
রুশ যুদ্ধজাহাজের নামঅ্যাডমিরাল গ্রিগোরোভিচ (Admiral Grigorovich)
ব্রিটিশ ইয়টের নামব্রাইট ফিউচার (Bright Future)
পর্যবেক্ষণকারী ব্রিটিশ জাহাজএইচএমএস মার্সি (HMS Mersey)
বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কালপঞ্চম বছর
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যঘটনাটি গভীর উদ্বেগজনক এবং বেপরোয়া

এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক নৌযানের নিরাপত্তা এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে পুনরায় প্রকাশ করেছে। ব্রিটিশ সরকার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনকারী এই ধরনের যেকোনো বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে তাদের শক্ত অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।