বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবারও সশস্ত্র অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্রধারী একদল দুর্বৃত্ত তিনজন তরুণ রাবার শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তুলে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট বাগান কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে। ঘটনাস্থল উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৮০ নম্বর আলীক্যং মৌজার মুসতইল্লা পাহাড় এলাকায় অবস্থিত আবীর রাবার বাগানের স্টাফ কোয়ার্টার। এটি একটি ঘন বনবেষ্টিত ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকা, যেখানে রাতের বেলায় চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গভীর রাতে ১২ থেকে ১৫ জনের একটি মুখোশধারী সশস্ত্র দল স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে এসে দরজা খোলার জন্য ডাকাডাকি করে। প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ভেতরে প্রবেশ করে সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। ওই সময় কোয়ার্টারে নারী-পুরুষসহ মোট ১৩ জন অবস্থান করছিলেন। আতঙ্কের মধ্যে দুর্বৃত্তরা তিনজন তরুণ শ্রমিককে আলাদা করে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
অপহৃত তিনজনই রাবার বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তারা হলেন— টেকনাফ উপজেলার শফিউল্লাহ কাটার বাসিন্দা মো. ছিদ্দিকের ছেলে নুরুল ইসলাম (২০), আনোয়ারের ছেলে এনামুল হক (২০) এবং খুইল্যা মিয়ার ছেলে হাসান (২০)। হঠাৎ এই ঘটনায় তাদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দরজা খোলার পরই মুখোশধারীরা ভেতরে ঢুকে চিৎকার বা প্রতিরোধ না করতে হুমকি দেয়। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তারা দ্রুত তিনজনকে টেনে বের করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। উপস্থিত কেউই পরিস্থিতির ভয়ে কোনো ধরনের প্রতিরোধ করতে পারেননি।
দুর্বৃত্তরা যাওয়ার সময় কোয়ার্টার থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন, দুটি দা এবং তিনটি টর্চলাইটও নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, তারা পূর্বপরিকল্পিতভাবে অপারেশন পরিচালনা করেছে এবং পুরো এলাকা সম্পর্কে আগেই অবগত ছিল।
ঘটনার পর বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি ও অরণ্য এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিচে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ঘটনার স্থান | আলীক্যং মৌজা, মুসতইল্লা পাহাড়, নাইক্ষ্যংছড়ি |
| ঘটনার সময় | ২২ এপ্রিল, গভীর রাত |
| অপহরণকারী | ১২–১৫ জন মুখোশধারী সশস্ত্র দুর্বৃত্ত |
| অপহৃত ব্যক্তি | নুরুল ইসলাম (২০), এনামুল হক (২০), হাসান (২০) |
| লুট হওয়া সামগ্রী | ৫টি মোবাইল, ২টি দা, ৩টি টর্চলাইট |
| বর্তমান অবস্থা | যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান |
আবীর রাবার বাগানের মালিক ও বাইশারী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবদুল করিম বান্টু বলেন, শ্রমিকদের কাছ থেকে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রশাসনকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু শ্রমিকদের জীবন নয়, পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানান, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অপহৃতদের নিরাপদে উদ্ধারের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্তে কাজ চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত উপস্থিতি সীমিত থাকে, যা অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। এর আগেও একই এলাকায় অপহরণের ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে মুক্তিপণের বিনিময়ে ভুক্তভোগীদের ছাড়িয়ে আনা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত অপহৃতদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়মিত টহল ব্যবস্থা বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।
