আলগরিদমের সমীকরণ: গ্রুপ পর্বের পরেই বিদায় নেবে ব্রাজিল, চ্যাম্পিয়ন ডাচরা

বিশ্বফুটবলের যেকোনো আসরেই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি এবং শিরোপার দাবিদার হিসেবে মাঠে নামে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। তবে তাদের বহুল আকাক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি অর্জনের মিশনটি দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে অধরাই রয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০০২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তারা কেবল একবারই, তথা ২০১৪ সালের ঘরোয়া বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। ২০২৬ সালের আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করেও ব্রাজিল দলকে নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উন্মাদনার কোনো কমতি নেই। ফুটবল বিশ্ব যখন মাঠের লড়াইয়ের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এক জার্মান অর্থনীতিবিদের করা একটি গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণী ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ইওয়াখিম ক্লেমেন্টের গাণিতিক গণনা ও ব্রাজিলের ভাগ্য

জার্মান বিনিয়োগ বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদ ইওয়াখিম ক্লেমেন্ট একটি বিশেষ গাণিতিক মডেল ও নিজস্ব কম্পিউটার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আসন্ন বিশ্বকাপের দলগুলোর পথচলা নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। তার এই বিশেষ গাণিতিক বিশ্লেষণ দাবি করছে, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার গ্রুপ পর্বের বাধা অতিক্রম করতে পারলেও নকআউট পর্বের একদম শুরুতেই, অর্থাৎ সেরা বত্রিশের রাউন্ড থেকেই বিদায় নেবে। অপরদিকে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম দুর্ভাগ্যবশত রানার্স-আপ হিসেবে পরিচিত নেদারল্যান্ডস এবার সব বাধা টপকে তাদের ফুটবল ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিজেদের ঘরে তুলবে।

ক্লেমেন্টের এই গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণীকে ফুটবল বিশ্ব অবহেলা করতে পারছে না। এর কারণ হলো, তিনি এর আগে টানা তিনটি ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম একদম নিখুঁতভাবে গণনা করে দেখিয়েছেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তিনি জার্মানির চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলেছিলেন, যা সত্য প্রমাণিত হয়। এরপর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তার গাণিতিক মডেলে ফ্রান্সের নাম বিজয়ী হিসেবে উঠে আসে এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ট্রফি জয়ের সমীকরণও তিনি শতভাগ মেলাতে সক্ষম হয়েছিলেন। টানা তিনবার সফল হওয়ার পর এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের জন্য তার তৈরি কম্পিউটার অ্যালগরিদম বিজয়ী হিসেবে নেদারল্যান্ডস দলকে বেছে নিয়েছে। তার মডেল অনুযায়ী, এবারের ফাইনালে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের এবং সেখানে পর্তুগালকে পরাজিত করে ডাচরা প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।

অর্থনৈতিক মডেলের পাঁচটি প্রধান সূচক

খেলার মাঠে বল গড়ানোর আগেই একজন অর্থনীতিবিদ কীভাবে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতুহল রয়েছে। ক্লেমেন্ট মূলত তার এই বিশেষ অর্থনৈতিক মডেলে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ব্যবহার করেন। এগুলো হলো:

  • মাথাপিছু জিডিপি: একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, যা ফুটবল অবকাঠামো ও উন্নত একাডেমি তৈরিতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে।

  • জনসংখ্যা: ফুটবল সংস্কৃতি বিদ্যমান এমন দেশের জনসংখ্যা যত বেশি, সেখান থেকে উদীয়মান প্রতিভা খুঁজে বের করার সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পায়।

  • আবহাওয়া: কোনো দেশের গড় তাপমাত্রা অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম কি না, যা ফুটবলারদের শারীরিক গঠন ও দীর্ঘমেয়াদী খেলা তৈরিতে প্রভাব ফেলে।

  • ফিফা র‍্যাংকিং: দলগুলোর বর্তমান ফর্ম, শক্তি এবং ধারাবাহিকতা পরিমাপের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।

  • স্বাগতিক দেশের সুবিধা: স্বাগতিক দেশ ঘরের মাঠে দর্শকদের কাছ থেকে যে বাড়তি মানসিক সমর্থন লাভ করে, তার একটি গাণিতিক হিসাব এই মডেলে যুক্ত করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের ফাইনালের পথ এবং ভাগ্যের ভূমিকা

ক্লেমেন্টের এই সিমুলেশন বা গাণিতিক অনুকরণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথটি মোটেও সহজ হবে না। ডাচদের ফাইনালে পৌঁছাতে হলে নকআউট পর্বে ক্রমান্বয়ে মরক্কো, কানাডা এবং কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে পরাজিত করতে হবে। এরপর সেমিফাইনালে স্পেনের কঠিন বাধা অতিক্রম করতে পারলে তবেই তারা ফাইনালের টিকিট পাবে।

নিচে ক্লেমেন্টের গাণিতিক মডেলের প্রধান দিকসমূহ এবং নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য যাত্রাপথের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

গাণিতিক মডেলের ভিত্তি (৫টি নিয়ামক)নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য নকআউট প্রতিপক্ষক্লেমেন্টের বিগত সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ
১. মাথাপিছু জিডিপি১. মরক্কো (রাউন্ড ৩২)১. ২০১৪ বিশ্বকাপ: জার্মানি
২. মোট জনসংখ্যা২. কানাডা (রাউন্ড ১৬)২. ২০১৮ বিশ্বকাপ: ফ্রান্স
৩. গড় আবহাওয়া ও তাপমাত্রা৩. ফ্রান্স (কোয়ার্টার ফাইনাল)৩. ২০২২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা
৪. বর্তমান ফিফা র‍্যাংকিং৪. স্পেন (সেমিফাইনাল)৪. ২০২৬ বিশ্বকাপ: নেদারল্যান্ডস (সম্ভাব্য)
৫. স্বাগতিক দেশের বাড়তি সুবিধা۵. পর্তুগাল (ফাইনাল)

তবে ব্রাজিল ভক্তদের এখনই সম্পূর্ণ হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ক্লেমেন্ট। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, ফুটবলে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ভাগ্যের ছোঁয়াও একটি বিশাল বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তার মতে, এই গাণিতিক মডেলে প্রায় ৪৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ ফলাফল স্রেফ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। দুটি দলের শক্তি যখন কাছাকাছি থাকে, তখন নির্দিষ্ট দিনের ভাগ্যই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ফলে, পরপর তিনবার তার মডেল মিলে গেছে দেখে তার কাছে কোনো জাদুকরী ক্রিস্টাল বল বা অলৌকিক ক্ষমতা আছে, এমনটা ভাবার কোনো कारण নেই। এখন মাঠের লড়াইয়েই প্রমাণিত হবে যে ক্লেমেন্টের এই অ্যালগরিদম সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে নাকি মাঠের আসল লড়াইয়ে সব সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যায়।