খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:৩ এএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বর্তমানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধিমালা ও আটক নীতি নিয়ে আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার পরেও অভিযোগ গঠন ছাড়াই অভিযুক্তদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
Table of Contents
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব কার্যবিধির ৯(৫) ধারায় আটক ও তদন্তের সময়সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে। এই বিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তদন্ত কর্মকর্তা সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করবেন। যদি বিশেষ কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ না থাকে এবং তদন্ত শেষ না হয়, তবে অভিযুক্তকে জামিন দেওয়া যেতে পারে। ট্রাইব্যুনাল কেবল লিখিত কারণ দর্শিয়ে তদন্তের মেয়াদ আরও সর্বোচ্চ ছয় মাস বাড়াতে পারে।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত পূর্ণ ১৫ মাস ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই আটক রয়েছেন। ড. তৌফিক-ই-ইলাহীর বয়স বর্তমানে ৮১ বছর। দীর্ঘ এক বছরের সীমা পার হওয়ার পরও কোনো লিখিত ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ ছাড়াই তাকে এবং আরও অন্তত সাতজন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে আটকে রাখা ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব আইনের পরিপন্থী হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তদন্তধীন অবস্থায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আইসিটির অধীনে আটক রয়েছেন এমন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| অভিযুক্তের নাম | পদবি/পরিচয় | আটকের স্থিতি (আনুমানিক) |
| ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী | সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা | ১৫ মাস+ |
| ডা. দীপু মনি | সাবেক মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| ফারুক খান | সাবেক মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| কামাল আহমেদ মজুমদার | সাবেক মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| শাহজাহান খান | সাবেক মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| গোলাম দস্তগীর গাজী | সাবেক মন্ত্রী | ১ বছর+ |
| শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক | সাবেক বিচারপতি | ১ বছর+ |
| ফজলে করিম চৌধুরী | সাবেক সংসদ সদস্য | ১ বছর+ |
যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী লর্ড কার্লাইল কেসি, যিনি এক সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনি পরামর্শক ছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কাউকে এক বছর বা তার বেশি সময় আটকে রাখা আইনি গ্রহণযোগ্যতা হারায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কমনওয়েলথ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, সেজন্য বর্তমান সরকারকে দ্রুত আইনি সংস্কার ও শাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
লর্ড কার্লাইলের ভাষ্যমতে:
“প্রমাণ থাকলে তা আদালতে উপস্থাপন করতে হবে। কেবল সন্দেহের বশে বা কোনো নথি ছাড়া দীর্ঘ সময় কাউকে হেফাজতে রাখা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। এটি কমনওয়েলথ আইনি কাঠামোর সঙ্গে অসংলগ্ন।”
একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে ‘আইনের শাসন’ বা Rule of Law অপরিহার্য। যদিও ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী আইনি সংশোধনীতে অপরাধের সংজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক মানের করা হয়েছে, তবুও আটক-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল এখনো দুর্বলতা প্রদর্শন করছে। প্রতিশোধমূলক বিচারের পরিবর্তে যদি নিরপেক্ষ ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হয়, তবে এই বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
আইসিটির উচিত নিজস্ব কার্যবিধির ৯(৫) ধারা বিশ্বস্ততার সাথে প্রয়োগ করা। যাদের বিরুদ্ধে এক বছরের মধ্যেও অভিযোগ গঠন করা যায়নি, তাদের জামিন প্রদান করা বা তদন্তের যৌক্তিক কারণ লিখিতভাবে প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আইনের শাসনের’ ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ন্যায়বিচার কেবল দণ্ড প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
মন্তব্য