খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫৪ পিএম

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট বা গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫৪৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক সম্পদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে মোট রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৫৪৬ দশমিক ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ অনেক বড় অঙ্কের বৈদেশিক সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দেশের আমদানি সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা কম হয়। আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল-৬ (বিপিএম-৬) পদ্ধতিতে একই সময়ে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৯০৭ বিলিয়ন ডলার বা ৩১ হাজার ৯০৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার।
গ্রস রিজার্ভ ও বিপিএম-৬ হিসাবের মধ্যে এই পার্থক্য মূলত হিসাব পদ্ধতির কারণে হয়ে থাকে। গ্রস রিজার্ভের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এমন সম্পদ বিবেচনা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহারযোগ্য এবং সহজে লেনদেনযোগ্য। এ কারণে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোনো দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফের হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আকস্মিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় এই রিজার্ভ বড় ধরনের নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক আস্থাও বৃদ্ধি পায়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার বাড়াতে কয়েকটি উৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় এবং বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিভিন্ন উদ্যোগও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা, ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো এবং অর্থনীতির বহির্বাণিজ্য খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে শুধু রিজার্ভের অঙ্ক বাড়লেই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয় না। রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
তাদের মতে, শক্তিশালী রিজার্ভ দেশের মুদ্রাবাজারে আস্থা বাড়াতে সহায়তা করে। তবে ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান ধরে রাখতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির মৌলিক খাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান রিজার্ভ পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ অব্যাহত রাখা, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হবে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মন্তব্য